রাশিয়া শনি রাত্রি থেকে রবিবার ভোর পর্যন্ত ইউক্রেনের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বণ্টন সুবিধাগুলিকে লক্ষ্য করে বিশাল আকাশীয় আক্রমণ চালায়। ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির জেলেনস্কি জানান, এই আক্রমণে ৪০০টিরও বেশি ড্রোন এবং প্রায় ৪০টি বিভিন্ন ধরণের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যা গ্রিড, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং বণ্টন সাবস্টেশনকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
জেলেনস্কি এক্স-এ লিখে উল্লেখ করেন, রাশিয়া প্রতিদিন বাস্তব কূটনীতি বেছে নিতে পারত, তবে সে পরিবর্তে নতুন আক্রমণ বেছে নিচ্ছে। তিনি ত্রিপাক্ষিক আলোচনার সমর্থকদের আহ্বান জানান, যাতে মস্কোকে শীতের ঠাণ্ডা ব্যবহার করে ইউক্রেনকে চাপে রাখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা যায়। এই মন্তব্যটি ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় চলমান আলোচনার কয়েক দিন পর প্রকাশিত হয়।
ইউক্রেনের জ্বালানি মন্ত্রী দেনিস শ্মিহাল টেলিগ্রাম মাধ্যমে জানিয়েছেন, আক্রমণে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের দুটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং বিদ্যুৎ বণ্টন ব্যবস্থার মূল উপাদান, যেমন সাবস্টেশন ও গুরুত্বপূর্ণ লাইনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, রাশিয়ার এই আক্রমণকে “অপরাধী” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং বিদ্যুৎ কর্মীরা নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তৎক্ষণাৎ মেরামত কাজ শুরু করতে প্রস্তুত।
শ্মিহাল আরও যোগ করেন, রাশিয়ার আক্রমণগুলো শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ঘটেছে, এবং আগামী দিনগুলোতে তাপমাত্রা -১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। শীতের তীব্র ঠাণ্ডা ইতিমধ্যে ইউক্রেনের দুর্বল বিদ্যুৎ জালকে অতিরিক্ত চাপ দিচ্ছে, ফলে গৃহস্থালীর বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরণের বিঘ্ন ঘটতে পারে।
যুদ্ধের শুরুর প্রায় চার বছর পর, রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ এবং ধারাবাহিক ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো ইউক্রেনের বিদ্যুৎ খাতকে গভীর সংকটে ফেলেছে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে সঞ্চিত ক্ষতি, শীতের কঠোরতা এবং ক্রমবর্ধমান আক্রমণ একসাথে বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা হ্রাস করেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন রাশিয়ার উপর চাপ বাড়াতে বহুবার আহ্বান জানিয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট কূটনৈতিক সমাধান দেখা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় চালু হওয়া আলোচনাগুলোও বাস্তব ফলাফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে, যা জেলেনস্কির মন্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে।
রাশিয়া স্বীকার করে না যে সে এই আক্রমণ চালিয়েছে এবং তৎক্ষণাত কোনো মন্তব্য করেনি। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করছেন, রাশিয়া ২০২৫ সালের শরৎকালে থেকেই ইউক্রেনের বিদ্যুৎ গ্রিডে আক্রমণ বাড়িয়ে দিয়েছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও দুর্বল করে তুলেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়ার এই ধারাবাহিক আক্রমণ কেবল সামরিক লক্ষ্যই নয়, বরং শীতের মৌসুমে ইউক্রেনের জনগণকে অতিরিক্ত কষ্টে ফেলে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল করার একটি কৌশল। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যাতে রাশিয়ার এই কৌশলকে থামিয়ে কূটনৈতিক চ্যানেলগুলোকে সক্রিয় করা যায়।
আসন্ন দিনগুলোতে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ কর্মীরা নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে ক্ষতিগ্রস্ত কেন্দ্রগুলো মেরামতে অগ্রসর হবে, তবে তাপমাত্রা হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়বে, যা পুনরায় আক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। তাই উভয় পক্ষের জন্যই শীতের আগে কূটনৈতিক সমঝোতা অর্জন করা জরুরি, যাতে মানবিক সংকট এবং অবকাঠামোগত ধ্বংসাবশেষের পরিমাণ কমানো যায়।



