১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সরকারের নীতি প্রয়োগে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে। প্রতিষ্ঠানগত সংস্কার স্থগিত, বেসরকারি খাতের ঋণ বৃদ্ধি হ্রাস এবং আর্থিক চাপে বাড়তি চাপের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরেও ব্যাঘাত দেখা দিয়েছে। একই সময়ে জানুয়ারি মাসের রপ্তানি সামান্য হ্রাস পেয়েও মাসিক ভিত্তিতে উন্নতি দেখিয়েছে, আর কর্পোরেট পরিবেশগত দাবি নিয়ে বাড়তি সন্দেহ উত্থাপিত হয়েছে।
ইন্টারিম সরকার শেষের দিকে আসার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে আলোচনা আটকে গিয়েছে। ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের খসড়া বহু মাস ধরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার জন্য প্রস্তাবিত সংশোধনগুলো এখনো কার্যকর হয়নি, ফলে নির্বাচনের আগে আর্থিক স্থিতিশীলতায় ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে স্বায়ত্তশাসনের বিলম্ব নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে আর্থিক বাজারের অস্থিরতা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচনের আগে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ স্বায়ত্তশাসন না থাকলে নীতি নির্ধারণে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে।
একই সময়ে বড় বড় কর্পোরেশনগুলোর পরিবেশগত দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন উঠেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান পরিবেশবান্ধব লেবেল ব্যবহার করে বাজারে নিজেদেরকে সবুজ হিসেবে উপস্থাপন করলেও, বাস্তবে তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিবেশকে ক্ষতি করে এমন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া দেখা যায়। এই ধরনের ‘গ্রীনওয়াশিং’ ব্যবসায়িক রিপোর্টিংয়ে স্বচ্ছতার অভাব এবং পরিবেশগত মানদণ্ডের প্রয়োগে দুর্বলতা নির্দেশ করে।
বেসরকারি খাতের ঋণ বৃদ্ধি রেকর্ড নিম্ন স্তরে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে বেসরকারি খাতে ক্রেডিটের বার্ষিক বৃদ্ধি দশকের সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ঋণদানের খরচ বৃদ্ধির ফলে ঋণ চাহিদা কমে গেছে, যা ব্যবসায়িক বিনিয়োগের সংকোচন ঘটাচ্ছে।
বছরের তুলনায় ক্রেডিটের সম্প্রসারণের হার নাটকীয়ভাবে ধীর হয়ে গেছে, যা তরলতার সংকট এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে। এই প্রবণতা আর্থিক বাজারের সুস্থতা বজায় রাখতে নীতি নির্ধারকদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
যদিও রপ্তানি মোটামুটি স্থিতিশীল, জানুয়ারি মাসে পণ্য রপ্তানি প্রায় ৪.৪১ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সামান্য কম। তবে মাসিক ভিত্তিতে রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং পোশাক শিল্প এখনও রপ্তানির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে রয়ে গেছে, যদিও বছরের তুলনায় সামান্য হ্রাস দেখেছে। বিদেশি অর্ডারের অনিশ্চয়তা এবং নির্বাচনের আগে বাজারের সতর্কতা এই প্রবণতাকে প্রভাবিত করেছে।
বাংলাদেশ সরকারের নেট ব্যাংক ঋণ প্রায় পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আর্থিক ঘাটতি বাড়িয়ে তুলেছে। ঋণ বৃদ্ধির ফলে সরকারি ব্যয়ের চাপ বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে আর্থিক নীতি সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা তীব্রতর হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরেও চলমান ব্যাঘাত বাণিজ্যিক লেনদেনে বাধা সৃষ্টি করেছে, যা রপ্তানি-আমদানি চেইনের ওপর অতিরিক্ত চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। বন্দর কার্যক্রমের স্বাভাবিকতা ফিরে না এলে বাণিজ্যিক প্রবাহে আরও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, এই সপ্তাহে দেখা গিয়েছে যে আর্থিক সংস্কার, ঋণ প্রবাহ এবং বাণিজ্যিক অবকাঠামোর সমস্যাগুলো সমাধান না হলে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির গতি ধীর হতে পারে। স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ পুনরুজ্জীবিত করা এবং পরিবেশগত দায়িত্বে স্বচ্ছতা আনা আগামী মাসে নীতি নির্ধারকদের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।



