নওগাঁ জেলার একটি হাসপাতালে ২৮ জানুয়ারি নারীর নিপাহ ভাইরাসের উপসর্গ দেখা দেয় এবং পরবর্তী পরীক্ষায় নিশ্চিত করা হয় যে তিনি ভাইরাসের কারণে মৃত্যুবরণ করেছেন। ইডিসিআর (ইনস্টিটিউট অফ ইপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ) এর বিজ্ঞান কর্মকর্তা শামিন সুলতানা জানান, রোগীর উপসর্গের ভিত্তিতে দ্রুত নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করা হয় এবং ফলাফল নিপাহ ভাইরাসের সনাক্তকরণ নিশ্চিত করে।
এই ঘটনা দেশের এই বছরের প্রথম নিপাহ সংক্রান্ত মৃত্যু হিসেবে রেকর্ডে যুক্ত হয়েছে। পূর্বে শেষ বার যখন নিপাহ রোগের মৃত্যু রেকর্ডে এলো, তা ছিল গত বছরের আগস্ট মাসে। সুতরাং, আগস্ট ২০২৫ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো নিপাহ সংক্রান্ত মৃত্যু ঘটেনি, এবং এই মৃত্যুর মাধ্যমে ২০২৬ সালের প্রথম কেস নিশ্চিত হয়েছে।
ইডিসিআর জানায়, ২০২৫ সালে নিপাহ ভাইরাসের চারজন রোগীর মৃত্যু রেকর্ডে রয়েছে। সেই বছর রোগের বিস্তার সীমিত থাকলেও, মৃত্যুর সংখ্যা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সতর্কতা বাড়িয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ প্রধানত প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে স্থানান্তরিত হয় এবং দ্রুত সনাক্তকরণ ও উপযুক্ত চিকিৎসা না হলে মারাত্মক হতে পারে।
নিপাহ ভাইরাসের উপসর্গের মধ্যে জ্বর, মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট এবং স্নায়বিক সমস্যার লক্ষণ দেখা দিতে পারে। রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক নির্ণয় করা কঠিন হতে পারে, তাই সন্দেহজনক ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর পরিবার ও আশেপাশের লোকজনকে রোগের সম্ভাব্য সংক্রমণ রোধে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করেছে। লক্ষ্য হল রোগের প্রাথমিক লক্ষণ সনাক্ত করে দ্রুত আইসোলেশন ও চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এছাড়া, রোগের বিস্তার রোধে পোষা প্রাণী ও বন্যপ্রাণীর সঙ্গে সংস্পর্শ কমিয়ে আনা জরুরি বলে জোর দেওয়া হয়েছে।
নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অপরিহার্য। নিয়মিত হাত ধোয়া, মুখে হাত না দেওয়া এবং রোগীর সঙ্গে সরাসরি শারীরিক সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা মৌলিক প্রতিরোধের উপায়। তাছাড়া, রোগের সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যোগাযোগ করা উচিত।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, যদিও নিপাহ ভাইরাসের কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ এখনো পাওয়া যায়নি, তবে সমর্থনমূলক চিকিৎসা রোগীর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে। তাই, রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ রোগীর পুনরুদ্ধার সম্ভাবনা বাড়ায়।
এই ঘটনার পর, নওগাঁ জেলার স্বাস্থ্য বিভাগ স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা ও পরীক্ষার সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। রোগীর পরিবারকে মানসিক সমর্থন প্রদান এবং রোগের প্রকৃতি সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানানোও গুরুত্বপূর্ণ বলে জোর দেওয়া হয়েছে।
নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সম্প্রদায়ের সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। স্থানীয় মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমে সঠিক তথ্য প্রচার করে ভয় ও গুজবের বিস্তার রোধ করা সম্ভব। স্বাস্থ্য কর্মীরা জনগণকে জানিয়ে দিচ্ছেন, সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করানোই সঠিক পদক্ষেপ।
বিগত বছরগুলোতে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ সীমিত হলেও, রোগের সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করে সরকার ও স্বাস্থ্য সংস্থাগুলি সতর্কতা অবলম্বন করছে। রোগের বিস্তার রোধে আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে, গবেষণা ও টিকাদান প্রোগ্রাম উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, নওগাঁয়ের এই কেস দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে। রোগের দ্রুত সনাক্তকরণ, যথাযথ আইসোলেশন এবং সমর্থনমূলক চিকিৎসা রোগীর জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পাঠকদের জন্য শেষ কথা: যদি আপনার বা আপনার পরিচিত কারো মধ্যে নিপাহ ভাইরাসের মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তবে তৎক্ষণাৎ নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করুন এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। আপনার সতর্কতা রোগের বিস্তার রোধে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।



