সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) পরিচালিত সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, দেশের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ভোটার—৭৭ শতাংশ—রাস্তাঘাট, কালভার্ট নির্মাণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে উন্নয়নের প্রধান সূচক হিসেবে বিবেচনা করেন। জরিপের ফলাফল শনিবার ঢাকার মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে অনুষ্ঠিত মিডিয়া ব্রিফিং‑এ উপস্থাপিত হয়, যেখানে দেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই ধারণা ভোটার আচরণকে কীভাবে প্রভাবিত করবে তা আলোচনা করা হয়।
ব্রিফিংয়ের শিরোনাম ছিল “নির্বাচনী এলাকায় সবুজ টেকসই অর্থনীতির চালচিত্র ও প্রত্যাশা: প্রার্থী ও ভোটার জরিপের ফলাফল” এবং এতে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রধান উপস্থাপক হিসেবে অংশ নেন। তার সঙ্গে সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত, অনুষ্ঠান সহযোগী সামি মোহাম্মদ, মালিহা সাবাহ ও নূর ইয়ানা জান্নাত উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান ফলাফল স্পষ্ট: ভোটারদের অধিকাংশই উন্নয়নকে অবকাঠামো নির্মাণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত করে। রাস্তাঘাটের উন্নতি, নতুন কালভার্টের নির্মাণ এবং চাকরি সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি এখন ভোটারদের জন্য ভোটের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই অবকাঠামো‑কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের নির্বাচনী কৌশলে সরাসরি প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। ভোটারদের কাছে দৃশ্যমান প্রকল্প এবং তাত্ক্ষণিক কর্মসংস্থান সুযোগের প্রতিশ্রুতি প্রার্থীর জনপ্রিয়তা বাড়াতে পারে।
পরিবেশ সংরক্ষণে ভোটারদের পছন্দও সহজ সমাধানের দিকে ঝুঁকে আছে। জরিপে ৬১ শতাংশ ভোটার গাছ রোপণ এবং প্লাস্টিক ব্যবহার কমানোর ওপর জোর দিয়েছেন, যা পরিবেশ রক্ষার জন্য সবচেয়ে সহজ পদক্ষেপ হিসেবে তারা বিবেচনা করেন। একই সময়ে বেশিরভাগ রাজনৈতিক প্রার্থীরাও এই ধরনের সহজ সমাধানকে সমর্থন করেছেন।
গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, ভোটাররা ব্যক্তিগতভাবে সহজে করতে পারা কাজকে পরিবেশ সুরক্ষার মূল উপায় হিসেবে দেখছেন। এই আচরণগত প্রবণতা দেখায় যে জটিল নীতি বা প্রযুক্তিগত সমাধানের বদলে দৈনন্দিন ছোটখাটো পরিবর্তনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন জনগণ।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্পর্কে সচেতনতা তুলনামূলকভাবে কম। ভোটারদের মধ্যে ৪৭ শতাংশই নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্পর্কে জানেন, আর প্রার্থীদের মধ্যে এই হার প্রায় ৪২ শতাংশে সীমাবদ্ধ। যদিও নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে টেকসই উন্নয়নের কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি রয়েছে।
সামাজিক দিক থেকে ভোটার ও প্রার্থীদের মনোযোগ সবচেয়ে কম। অর্থনীতি ও পরিবেশের তুলনায় সামাজিক স্তম্ভকে তারা কম গুরুত্ব দেন, যা জরিপে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
এটির পেছনে মূল কারণ হিসেবে দারিদ্র্য, আয় ও কর্মসংস্থানের চাপকে উল্লেখ করা হয়েছে। এই মৌলিক সমস্যাগুলো ভোটারদের জন্য তাত্ক্ষণিক উদ্বেগের বিষয়, ফলে সামাজিক উন্নয়নের প্রশ্নগুলো গৌণ হয়ে পড়ে।
যদিও সামাজিক বিষয়গুলো সামগ্রিকভাবে কম গুরুত্ব পায়, তবু ভোটারদের জন্য স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। জরিপে দেখা যায়, মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার উন্নয়নকে ভোটাররা সবচেয়ে জরুরি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
সিপিডি এই ফলাফল থেকে উপসংহারে পৌঁছেছে যে দেশের বড় একটি অংশ এখনও মৌলিক চাহিদা—খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা—নির্বাহের সংগ্রামে লিপ্ত। এই বাস্তবতা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি চ্যালেঞ্জ, কারণ তারা অবকাঠামো প্রকল্পের পাশাপাশি মৌলিক সেবা প্রদানেও মনোযোগ দিতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভবিষ্যৎ নির্বাচনী প্রচারাভিযানগুলোতে রাস্তাঘাট, কালভার্ট ও কর্মসংস্থানকে প্রধান মন্ত্র হিসেবে তুলে ধরা হবে, তবে ভোটারদের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রেও স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।
প্রার্থীরা যদি পরিবেশ সংরক্ষণে শুধুমাত্র গাছ রোপণ ও প্লাস্টিক কমানোর মতো সহজ পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও টেকসই প্রযুক্তি সংক্রান্ত বিস্তৃত নীতিগুলো ভোটারদের কাছ থেকে যথেষ্ট সমর্থন পাবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সারসংক্ষেপে, সিপিডি জরিপ ভোটারদের উন্নয়ন ধারণা অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান কেন্দ্রীক, পরিবেশে সহজ সমাধানকে অগ্রাধিকার, এবং মৌলিক সামাজিক সেবার প্রতি উচ্চ চাহিদা প্রকাশ করেছে। এই প্রবণতা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করবে, বিশেষ করে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতিতে।



