গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি আক্রমণের ফলে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞে পরিবহন নেটওয়ার্কের ক্ষতি প্রায় ২.৫ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ২৫০ কোটি ডলার হিসেবে অনুমান করা হয়েছে। এই সংখ্যা কাতারভিত্তিক একটি সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে এবং অঞ্চলের অবকাঠামো পুনর্গঠনের খরচের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বহু শত শত ভবন ধ্বংস হয়েছে, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন, এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সেবার অবস্থা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। গাজার বাসিন্দারা মৌলিক পরিষেবা ছাড়া বেঁচে থাকার জন্য কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে জ্বালানি সরবরাহের অভাবও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গাজার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাসান এল-নাবিহের দৈনন্দিন রুটও এই ধ্বংসাবশেষের প্রভাবের উদাহরণ দেয়। তিনি প্রতিদিন সকালে সাইকেলে ব্রিফকেস ও ল্যাপটপ বাঁধে এবং কাজের সন্ধানে বের হন, কারণ গাড়ি চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ এখন প্রায় অসম্ভব।
এল-নাবিহের গাড়ি ডিসেম্বর ২০২৩-এ গাজা শহরের শুজাইয়া পাড়ায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উভয় উইন্ডোস্ক্রিন ভেঙে যায় এবং ইঞ্জিন কাজ করা বন্ধ করে, ফলে গাড়িটি ব্যবহারযোগ্য নয়। তিনি উল্লেখ করেন, “আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলাম, তখন কাছাকাছি একটি ভবনে আকাশ থেকে বোমা নিক্ষেপ হয়।” এই ঘটনার পর থেকে তিনি সাইকেলকে একমাত্র পরিবহন মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছেন।
পরিবহন ব্যবস্থার ক্ষতি গাজার অর্থনৈতিক কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। পণ্য ও সেবার সরবরাহে বাধা, কৃষি উৎপাদনের বাজারে পৌঁছাতে অসুবিধা, এবং কর্মসংস্থান হ্রাস—all these factors intensify মানবিক সংকটকে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি গাজার পুনর্গঠন পরিকল্পনায় পরিবহন অবকাঠামোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।
আঞ্চলিক পর্যায়ে, এই ধ্বংসাবশেষের পরিমাণ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এক বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, “গাজার অবকাঠামো ধ্বংসের পরিমাণই ভবিষ্যতে শান্তি আলোচনার শর্তাবলীর একটি মূল উপাদান হয়ে উঠবে।” ফলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখন গাজার পুনর্নির্মাণে আর্থিক সহায়তা ও প্রযুক্তিগত সমর্থন নিশ্চিত করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
ইসরায়েল ও প্যালেস্টাইনের মধ্যে চলমান সংঘাতের ফলে গাজার মানবিক অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে, এবং এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি নৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য দেশ গাজার পুনরুদ্ধার প্রকল্পে তহবিল বরাদ্দের কথা ঘোষণা করেছে, তবে বাস্তবায়নের গতি এখনও ধীর।
গাজার পরিবহন নেটওয়ার্কের পুনর্নির্মাণের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা এখনো স্পষ্ট নয়, তবে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দাতাদের মতে, পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে জরুরি রুট পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘমেয়াদে রেলওয়ে ও সড়ক নেটওয়ার্কের আধুনিকায়ন পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এই সময়ে গাজার বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনে পরিবর্তন আনা জরুরি, বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো ইতিমধ্যে অস্থায়ী ক্লিনিক ও শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করেছে, তবে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ অপরিহার্য।
কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, গাজার অবকাঠামো ক্ষতি আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক নীতির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জাতিসংঘের মানবিক সমিতি গাজার পুনর্গঠনকে একটি অগ্রাধিকার বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছে এবং সকল পক্ষকে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে আহ্বান জানিয়েছে।
সারসংক্ষেপে, গাজা উপত্যকায় পরিবহন ব্যবস্থার ক্ষতি ২৫০ কোটি ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা মানবিক সংকটকে আরও তীব্র করেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য পুনর্নির্মাণ ও শান্তি প্রক্রিয়ার নতুন চ্যালেঞ্জ উন্মোচন করেছে। ভবিষ্যতে গাজার অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের সাফল্যই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও শান্তির ভিত্তি গড়ে তুলবে।



