মানবাধিকার সংস্থা ওধিকার আজ প্রকাশিত ফিল্ড মনিটরিং প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে রেকর্ড করা প্রায় অর্ধেক নির্বাচনী সহিংসতা মামলায় কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ১৮ জানুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়কালে ২২টি জেলা, ৫০টি সংসদীয় এলাকা জুড়ে মোট ৩০টি সহিংসতা ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।
এই ঘটনাগুলির বেশিরভাগই গ্রামীণ এলাকায় ঘটেছে এবং প্রধানত বিএনপি ও জামায়াত-এ-ইসলামি সমর্থকদের অংশগ্রহণে সংঘটিত হয়েছে। ওধিকার কর্তৃক সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ১৪টি জেলায় মোট ৩০টি ঘটনা নথিভুক্ত করা হলেও, ৪৭ শতাংশ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ কোনো তদন্ত বা সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি, যা অপরাধের প্রতি সহনশীলতার ধারণা বাড়িয়ে তুলেছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ঘটনা ভোটার ও প্রার্থীদের ভোটদান বা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করেছে। সহিংসতার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, হুমকি ও হয়রানি ৩৩ শতাংশ, সম্পত্তি ধ্বংস ২০ শতাংশ, শারীরিক সংঘর্ষ ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাধা প্রত্যেকটি ১৭ শতাংশ করে ঘটেছে। হুমকি ও হয়রানি সবচেয়ে প্রচলিত কৌশল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
ভৌগোলিকভাবে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারকে প্রধান হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে; চট্টগ্রামে সাতটি, কক্সবাজারে চারটি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। ঘটনাগুলির দুই-তৃতীয়াংশ ইউনিয়ন পরিষদে, আর অর্ধেকের বেশি জনসাধারণের স্থান যেমন রাস্তা ও বাজারে ঘটেছে।
ওধিকার এই ফলাফলগুলো গুলশানের একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত প্রেস ব্রিফিং-এ উপস্থাপন করেছে, যেখানে “প্রি-ইলেকশন পিরিয়ডে নির্বাচনী সহিংসতা: ফিল্ড মনিটরিং থেকে প্রমাণ” শিরোনামে আলোচনা হয়। এই উদ্যোগের জন্য ইউরোপীয় পার্টনারশিপ ফর ডেমোক্রেসি (EPD) আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে।
ব্রিফিংয়ে উপস্থিত বক্তারা নির্বাচন কমিশন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাছে গ্রামীণ নির্বাচনী এলাকা গুলোতে উপস্থিতি বাড়াতে এবং আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে আহ্বান জানিয়েছেন। তারা জোর দিয়ে বলেছেন, যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হয় তবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারকে ক্ষতি হবে।
প্রতিবেদনটি আরও উল্লেখ করেছে, বিএনপি সমর্থকরা সর্বোচ্চ সংখ্যক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত, তারপরে জামায়াত-এ-ইসলামি সমর্থকরা রয়েছে। যদিও উভয় দলের সমর্থকই সহিংসতায় জড়িত, তবে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এই তথ্যগুলো নির্বাচনের পূর্বে রাজনৈতিক পরিবেশের অবনতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে। বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, যদি এই ধরণের সহিংসতা এবং কর্তৃপক্ষের অপ্রতিস্পন্দন অব্যাহত থাকে, তবে ভোটার অংশগ্রহণের হার কমে যেতে পারে এবং নির্বাচনের ফলাফলে প্রশ্ন উঠতে পারে।
অধিকন্তু, ওধিকার উল্লেখ করেছে যে, নির্বাচনী সহিংসতার প্রভাব শুধুমাত্র ভোটারদের ওপর সীমাবদ্ধ নয়; প্রার্থী ও তাদের ক্যাম্পেইন কর্মীদেরও হুমকি ও বাধার মুখে পড়তে পারে, যা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার স্বাভাবিক গতিপথকে ব্যাহত করে।
সারসংক্ষেপে, ওধিকার রিপোর্টে দেখা যায়, নির্বাচনী সহিংসতার বেশিরভাগই গ্রামীণ এলাকায় ঘটেছে, যেখানে আইন প্রয়োগের ঘাটতি স্পষ্ট। কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও নিরপেক্ষ হস্তক্ষেপের অভাবের ফলে ভোটার ও প্রার্থীদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে রয়েছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। ভবিষ্যতে নির্বাচনী সময়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যাতে ভোটারদের অধিকার রক্ষিত হয় এবং নির্বাচনের ফলাফল বৈধতা পায়।



