চট্টগ্রাম বন্দর কর্মীরা আগামীকাল সকাল থেকে অনির্দিষ্টকালীন ধর্মঘট শুরু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ধর্মঘটের মূল কারণ হল নতুন মোরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (NCT) কে সংযুক্ত আরব আমিরাতের DP World কোম্পানির কাছে লিজে দেওয়ার পরিকল্পনা। এই সিদ্ধান্তের ফলে বন্দর পরিচালনা, রপ্তানি-আমদানি এবং দেশের বাণিজ্যিক প্রবাহে সরাসরি প্রভাব পড়বে।
আজ দুপুর ১২:৩০ টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়কারী মো. হুমায়ুন কবির ও মো. ইব্রাহিম খোকান ধর্মঘটের ঘোষণা দেন। উভয় সমন্বয়কারী কর্মীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের নাম এবং তাদের অবস্থান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়।
বন্দরের নতুন মোরিং কন্টেইনার টার্মিনালকে DP World-কে লিজে দেওয়ার প্রস্তাবটি কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক বিরোধের সৃষ্টি করেছে। তারা যুক্তি দেন যে বিদেশি অপারেটরের হাতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হস্তান্তর দেশের স্বার্থের বিরোধিতা করে এবং স্থানীয় শ্রমিকের অধিকারকে ক্ষুন্ন করে।
কর্মীরা চারটি মূল দাবি উপস্থাপন করেছে। প্রথমত, NCT-কে DP World-কে হস্তান্তর করার প্রস্তাবটি সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা। দ্বিতীয়ত, বন্দর চেয়ারম্যানকে পদত্যাগে বাধ্য করা। তৃতীয়ত, চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগিত দুর্নীতির ব্যাপারে একটি স্বচ্ছ এবং ব্যাপক তদন্ত শুরু করা। চতুর্থত, এই দাবিগুলি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত বন্দর কার্যক্রমে সম্পূর্ণ অব্যাহত রাখা।
ধর্মঘটের সময় কর্মীরা বন্দরটির বাইরের নোঙরস্থলে থাকা মূল জাহাজ থেকে পণ্য গ্রহণ বন্ধ করার পরিকল্পনা করেছে। এর ফলে মাদার ভেসেল থেকে কন্টেইনার লোডিং ও আনলোডিং বন্ধ হয়ে যাবে এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে অতিরিক্ত সময় অপেক্ষা করতে হবে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই পদক্ষেপটি তাত্ক্ষণিকভাবে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা হ্রাস করবে। চট্টগ্রাম বন্দর, যা দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং মোট রপ্তানি-আমদানি কার্যক্রমের প্রায় অর্ধেক পরিচালনা করে, তার কাজের গতি কমে যাওয়ায় জাহাজের শেডিউল ব্যাহত হবে। ফলে পণ্য সরবরাহে বিলম্ব, স্টক ঘাটতি এবং শেষ গ্রাহকের কাছে পণ্যের ডেলিভারিতে দেরি ঘটবে।
শিপিং লাইনগুলোকে অতিরিক্ত খরচ এবং সময়সীমা পুনর্গঠন করতে হবে। লোডিং ও আনলোডিং বন্ধ হওয়ায় কন্টেইনারের টার্নঅ্যারাউন্ড সময় বৃদ্ধি পাবে, যা আন্তর্জাতিক শিপিং রেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও সরকারকে সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।
বন্দরের দৈনিক আয়, টার্নওভার ফি এবং লোডিং চার্জে উল্লেখযোগ্য হ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারী বাজেটের ওপরও প্রভাব পড়বে, কারণ বন্দর থেকে প্রাপ্ত কর ও ফি দেশের বাণিজ্যিক আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ গঠন করে। দীর্ঘমেয়াদী ধর্মঘটের ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকারীর আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে এবং ভবিষ্যতে অবকাঠামো প্রকল্পে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
বাজারে ইতিমধ্যে এই সংবাদে শেয়ার মূল্যে সামান্য ওঠানামা দেখা গেছে, বিশেষ করে রপ্তানি-নির্ভর শিল্পের শেয়ারগুলোতে সতর্কতা বৃদ্ধি পেয়েছে। শিপিং এজেন্সিগুলো সম্ভাব্য দেরি মোকাবিলায় বিকল্প বন্দর ও রুটের পরিকল্পনা শুরু করেছে, যা অতিরিক্ত লজিস্টিক খরচের দিকে নিয়ে যাবে।
অবস্থা কীভাবে উন্নত হবে তা এখনো অনিশ্চিত, তবে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি বন্দর চেয়ারম্যানের পদত্যাগ ও দুর্নীতি তদন্তের দাবি পূরণ না হয়, ধর্মঘটের সময়সীমা বাড়তে পারে এবং বাণিজ্যিক ক্ষতি বাড়বে। অন্যদিকে, সরকার যদি দ্রুত সমঝোতা করে এবং NCT-র লিজ প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করে, তবে ক্ষতি সীমিত করা সম্ভব হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্মীদের ধর্মঘট দেশের বাণিজ্যিক পরিবেশে তাত্ক্ষণিক বিঘ্ন সৃষ্টি করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের পরিবেশে অনিশ্চয়তা বাড়াবে। সরকার ও বন্দর কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও স্বচ্ছ পদক্ষেপই পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার মূল চাবিকাঠি হবে।



