ঢাকার পূর্বাঞ্চলের এক ব্যস্ত গলির কোণে, রিনা আকতার পরিচালিত একটি ছোট আশ্রয়কেন্দ্র ২০২৪ সাল থেকে যৌনকর্মীর সন্তানদের জন্য নিরাপদ বাসস্থান ও শিক্ষার ব্যবস্থা করে চলেছে। বর্তমানে ৪১টি শিশুরা এখানে বাস করে, যাদের বেশিরভাগই স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণকারী যৌনকর্মীর সন্তান। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হল শিশুরা ক্ষুধা ও ভয়ের ছায়া থেকে মুক্ত হয়ে সুষ্ঠু শিক্ষা পেতে পারে।
আশ্রয়কেন্দ্রের নিচতলায় তিনটি ছোট ঘরে শিশুরা বই, খেলনা ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটায়। সকালবেলা তারা পাঠের জন্য একত্রিত হয়, বিকেলে দৌড়ঝাঁপ ও খেলায় মেতে থাকে, আর সন্ধ্যায় অতিথি আসলে স্নেহের আলিঙ্গন পায়। এই স্থানটি তাদের জন্য বাড়ি, স্কুল এবং নিরাপত্তার একত্রিত মূর্ত রূপ।
শিশুদের শিক্ষার দিকটি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। ২১টি শিশুই কাছাকাছি দুইটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়মিত ভর্তি, আর বাকি শিশুরা আশ্রয়কেন্দ্রের তিনজন শিক্ষক দ্বারা দৈনিক পাঠ গ্রহণ করে। শিক্ষকরা পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি মৌলিক গণিত, বাংলা ও ইংরেজি দক্ষতা বাড়াতে অতিরিক্ত কার্যক্রমও পরিচালনা করেন।
খাবার ব্যবস্থা চার বেলা প্রদান করা হয়; সকালের নাস্তা, মধ্যাহ্নভোজন, বিকালের স্ন্যাক এবং রাতের খাবার। খাবারগুলো স্থানীয় বাজার থেকে তাজা উপকরণ ব্যবহার করে প্রস্তুত করা হয়, যাতে শিশুরা পুষ্টিকর ও সুষম আহার পায়। আশ্রয়কেন্দ্রের পরিচালনা দল রিনা এবং তার সংগঠন ‘কল্যাণময়ী নারী সংঘ’ এর স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে গঠিত।
রিনা আকতার বলেন, শিশুরা জন্মের পর থেকেই অবহেলার মধ্যে বড় হয়; তিনি চান এই আশ্রয়ে তারা ক্ষুধা ও ভয় ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠুক। তার এই দৃষ্টিভঙ্গি ২০২০ সালে BBC-র ১০০ প্রভাবশালী নারীর তালিকায় স্থান পাওয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।
রিনার এই উদ্যোগ হঠাৎ করে শুরু হয়নি। পূর্বে তিনি অন্য একটি শিশু যত্ন কেন্দ্রে কাজ করতেন, যেখানে একই ধরনের শিশুরা ছিল। সেখানে তিনি লক্ষ্য করেন যে শিশুরা প্রায়ই খাবার পায় না এবং পরিচালকের অবহেলা ও গালিগালাজের মুখোমুখি হন। এই অভিজ্ঞতা তাকে নিজের উদ্যোগ গড়ে তোলার সংকল্পে প্রেরণা দেয়।
নিজের সঞ্চয় এবং কয়েকটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সমর্থনে রিনা ‘কল্যাণময়ী নারী সংঘ’ গঠন করেন এবং আশ্রয়কেন্দ্রের ভিত্তি স্থাপন করেন। সংগঠনটি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবক ভিত্তিক, আর পরিচালন ব্যয় মূলত দাতব্য অনুদান ও স্থানীয় ব্যবসার দান থেকে সংগ্রহ করা হয়।
আশ্রয়কেন্দ্রের পাশে একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রও রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের সহযোগিতায় পরিচালিত হয়। এই কেন্দ্রটি মূলত যৌনকর্মী নারীদের জন্য স্বাস্থ্য পরীক্ষা, গর্ভনিরোধক সরবরাহ এবং মানসিক পরামর্শের সেবা প্রদান করে। বর্তমানে প্রায় ৪৭৮জন যৌনকর্মী নিয়মিত এই সেবায় অংশ নেয়।
এই নারীদের অধিকাংশই মাদকাসক্তি ও অনিরাপদ কাজের পরিবেশের শিকার। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দায়িত্বে আছেন আকতারের স্ত্রী, খাতুন, যিনি নারীদের পুনর্বাসন ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ প্রোগ্রাম চালু করেছেন। সেবার মাধ্যমে নারীরা মৌলিক স্বাস্থ্য জ্ঞান অর্জন করে এবং ভবিষ্যতে নিরাপদ কর্মসংস্থানের দিকে অগ্রসর হতে পারে।
শিশু ও নারীর উভয়ের জন্য এই সমন্বিত সেবা এলাকার সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রিনা ও তার দল প্রত্যেক শিশুকে শিক্ষা ও পুষ্টির মাধ্যমে স্বনির্ভরতা অর্জনের সুযোগ দিচ্ছেন, আর যৌনকর্মী নারীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে তাদের জীবনের গুণগত মান উন্নত করছেন।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার এই মডেলটি সম্প্রসারিত করতে স্থানীয় স্কুল ও স্বাস্থ্য বিভাগকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়। পাঠকরা যদি আশ্রয়কেন্দ্রের কার্যক্রমে স্বেচ্ছাসেবী হতে চান, তবে খাবার, পাঠ্যপুস্তক বা আর্থিক দান দিয়ে সরাসরি সাহায্য করতে পারেন; ছোট অবদানও শিশুর ভবিষ্যৎ গড়তে বড় ভূমিকা রাখে।



