সৌদি আরব সরকার সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে দেশটির উটের জন্য সরকারি পাসপোর্ট ইস্যু করা হবে, যাতে লক্ষ লক্ষ প্রাণীর নিবন্ধন ও ব্যবস্থাপনা সহজ হয়। এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হল উটের স্বাস্থ্য, মালিকানা ও চলাচল ট্র্যাক করা, যা দেশের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বার্থ রক্ষায় সহায়তা করবে। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, সৌদিতে প্রায় ২২ লক্ষ উট রয়েছে, যা বার্ষিক দুই বিলিয়ন রিয়াল থেকে বেশি আয় করে।
বিশ্বব্যাপী উটের মোট সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন কোটি, যার মধ্যে আরব উপসাগরীয় দেশগুলো প্রাধান্য পায়। আরব নিউজের তথ্য অনুযায়ী, সৌদির পরেই সোমালিয়া, সুদান, মৌরিতানিয়া এবং ইয়েমেন উটের বড় ভাণ্ডার ধারণ করে। এই দেশগুলোতে উটের সংখ্যা এক কোটি সত্তর লাখের কাছাকাছি, যা অঞ্চলীয় কৃষি ও পরিবহন ব্যবস্থার মূল স্তম্ভ।
উট সৌদি আরবের জাতীয় প্রতীকের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বহুবার জাতীয় উৎসব ও ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে এর উপস্থিতি অপরিহার্য বলে বিবেচিত হয়। দেশীয় উট সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীতে শীর্ষস্থানীয় প্রাণীগুলোকে পুরস্কৃত করা হয়, যা স্থানীয় গর্ব ও পর্যটন আয় বৃদ্ধি করে।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে উটের ভূমিকা বিশ শতকের শুরুর দিকে মক্কা ও মদিনা শহরে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত। আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া ও এমনকি চীন থেকে আসা হজরত ও হজরত কফেলারা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে উটের পিঠে সৌদিতে পৌঁছাতেন। এই ঐতিহ্যিক ব্যবহার অঞ্চলীয় বাণিজ্য ও ধর্মীয় সংযোগের ভিত্তি গড়ে তুলেছিল।
সাম্প্রতিক গবেষণায় সৌদির পাথরে খোদাই করা উটের ভাস্কর্যগুলোকে বিশ্বের প্রাচীনতম প্রাণীচিত্রের একটি উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০১৮ সালে এই ভাস্কর্যগুলো প্রথমবারের মতো উন্মোচিত হয়, এবং গবেষকরা অনুমান করেন যে সেগুলো প্রায় দুই হাজার বছর পুরনো। পাথরের বয়স নির্ধারণে জৈব উপাদানের অভাবের কারণে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়, তবু এই নিদর্শনগুলো প্রস্তর যুগের পূর্বে, গিজার পিরামিডের চেয়েও পুরনো হতে পারে।
সৌদি আরবের উট পাসপোর্ট প্রকল্পটি কেবল জাতীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; এটি গ্লোবাল স্তরে পশু স্বাস্থ্য ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে পারে। একই সময়ে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘোড়া ও গরু নিবন্ধন ব্যবস্থা সম্প্রসারণের সঙ্গে তুলনা করা যায়, যেখানে ডিজিটাল রেজিস্ট্রি ও ভ্যাকসিনেশন রেকর্ড একত্রিত করা হয়েছে।
একজন কূটনীতিকের মতে, উটের পাসপোর্ট ব্যবস্থা গ্লোবাল পশু বাণিজ্যের স্বচ্ছতা বাড়াবে এবং রোগের বিস্তার রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি উল্লেখ করেন যে, রেজিস্ট্রেশন সিস্টেমের মাধ্যমে সীমানা পারাপার সহজ হবে, যা GCC দেশগুলোর মধ্যে কৃষি পণ্য রপ্তানি ও আমদানি প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করবে।
অন্যদিকে, পশু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন যে, উটের রোগ নির্ণয় ও টিকাদান রেকর্ড ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করলে মহামারী নিয়ন্ত্রণে বড় সহায়তা হবে। তারা আশা করেন যে, ভবিষ্যতে এই ডেটাবেসে জেনেটিক তথ্যও যুক্ত হবে, যা প্রজনন নীতি ও জাতীয় গুণগত মান উন্নয়নে কাজে লাগবে।
প্রকল্পের বাস্তবায়ন ধাপে ধাপে হবে; প্রথম পর্যায়ে সব উটের মৌলিক তথ্য সংগ্রহ করে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেস তৈরি করা হবে। পরবর্তী ধাপে ভ্যাকসিনেশন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার রেকর্ড যুক্ত করা হবে, এবং শেষ পর্যায়ে ডিজিটাল পাসপোর্টের মাধ্যমে সীমান্ত পারাপার স্বয়ংক্রিয় করা হবে। এই পরিকল্পনা ২০২৬ সালের শেষের মধ্যে সম্পূর্ণ হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সৌদি আরবের এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পশু নিবন্ধন ও ট্র্যাকিং সিস্টেমের মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। GCC দেশগুলো ইতিমধ্যে এই ধরণের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য আলোচনায় রয়েছে, যা ভবিষ্যতে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পর্যটনকে নতুন দিগন্তে নিয়ে যাবে। উটের পাসপোর্টের মাধ্যমে ঐতিহ্য ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় সৌদি আরবের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে শক্তিশালী করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কেও নতুন মাত্রা যোগ করবে।



