পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের ত্রালাই এলাকার ইমাম বারগাহ কাসর‑ই‑খাদিজাতুল কুবরা মসজিদে শুক্রবার জুমা নামাজের সময় আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ ঘটেছে। হামলায় অন্তত একত্রে ৩১ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আরও ১৬৯ জন আহত হয়েছেন। দায় স্বীকার করে ইসলামিক স্টেট (আইএস) এই হামলাকে নিজের হাতে পরিচালিত বলে জানিয়েছে।
স্থানীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানান, বোমা হামলাকারী মসজিদের প্রবেশদ্বার পর্যন্ত পৌঁছানোর পর নিরাপত্তা কর্মীদের দ্বারা বাধা দেওয়া হয়। বাধা সত্ত্বেও তিনি সঙ্গে সঙ্গে বোমা বিস্ফোরণ করে বড় ধাক্কা সৃষ্টি করেন। বিস্ফোরণটি জুমা নামাজের প্রথম রাকাতে ঘটার ফলে মসজিদে উপস্থিত বিশাল সংখ্যক মুসলিমের ওপর সরাসরি আঘাত হানেন।
মসজিদটি শিয়া সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় কেন্দ্র, যেখানে জুমা নামাজের সময় বিশাল ভিড় থাকে। উপস্থিত এক ধর্মীয় কর্মী মোহাম্মদ কাজিমের মতে, নামাজের সূচনা মাত্রই তীব্র বিস্ফোরণ শোনা যায় এবং মসজিদে বিশাল ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন দেখা যায়। অন্য এক উপাসক ইমরান মাহমুদ উল্লেখ করেন, বিস্ফোরণের পর বোমা চালক ও তার সম্ভাব্য সহায়কদের সঙ্গে নিরাপত্তা স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে গুলিবর্ষণ হয়।
এই ঘটনার পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ দ্রুত তদন্তের নির্দেশ দেন এবং সংশ্লিষ্ট সকল দায়িত্বশীলকে আইনের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে তৎপরতা বজায় রাখা হবে।
ইসলামাবাদে এই আত্মঘাতী বোমা হামলাকে ২০০৮ সালের মারিয়ট হোটেল আত্মঘাতী বোমা হামলার পর সর্বোচ্চ প্রাণঘাতী ঘটনারূপে গণ্য করা হচ্ছে। ২০০৮ সালের সেই হামলায় ২০০ টিরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল। বর্তমান ঘটনার পরিসংখ্যান অনুসারে, ৩১ জনের মৃত্যু এবং ১৬৯ জনের আঘাতের সংখ্যা দেশের সাম্প্রতিক সেক্টারিয়াল সহিংসতার মধ্যে সর্বোচ্চ।
পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যা প্রায় ২৪১ মিলিয়ন, যার মধ্যে সুন্নি মুসলিমের সংখ্যা বেশী। শিয়া সম্প্রদায় সংখ্যালঘু হলেও দেশের বিভিন্ন অংশে তাদের ওপর ধারাবাহিক সেক্টারিয়াল আক্রমণ ঘটছে। তেহরিক‑ই‑তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) সহ বিভিন্ন উগ্র গোষ্ঠী অতীতে শিয়া ধর্মীয় স্থাপনা ও উপাসকদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে এসেছে।
হামলার পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। স্থানীয় পুলিশ ও ফৌজদারি তদন্ত বিভাগ ঘটনাস্থল থেকে প্রমাণ সংগ্রহ, বোমা ধ্বংসাবশেষ বিশ্লেষণ এবং সন্দেহভাজনদের অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া, বোমা চালকের পরিচয় ও তার সহায়কদের সনাক্তকরণের জন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলি আন্তর্জাতিক তথ্যভাণ্ডার থেকে তথ্য সংগ্রহের কাজ করছে।
আইএসের দায় স্বীকারোক্তি অনুসারে, বোমা চালক এক্সপ্লোসিভ ভেস্ট পরিধান করে মুসলিম উপাসকদের লক্ষ্যবস্তু করে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। এই ধরনের আত্মঘাতী আক্রমণ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের একটি পরিচিত পদ্ধতি, যেখানে বোমা চালককে আত্মহত্যার মাধ্যমে বৃহৎ সংখ্যক মানুষকে হত্যা করা হয়।
পাকিস্তান সরকার এখন থেকে এই ধরনের সেক্টারিয়াল সহিংসতা রোধে আইনগত কাঠামো শক্তিশালী করার পাশাপাশি, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, ভবিষ্যতে মসজিদ ও ধর্মীয় স্থাপনার নিরাপত্তা বাড়াতে অতিরিক্ত গার্ড, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া দল গঠন করা হবে।
এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও শোক প্রকাশ করেছে এবং পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার আহ্বান জানিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা ও ধর্মীয় সংগঠনগুলো শিয়া সম্প্রদায়ের প্রতি সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে, সকল ধর্মীয় গোষ্ঠীর নিরাপদ সমাবেশের অধিকার রক্ষার জন্য চাপ দিচ্ছে।
হামলার তদন্ত চলাকালীন সময়ে, সংশ্লিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া ও আদালতের কার্যক্রমের আপডেট প্রদান করা হবে। নিরাপত্তা সংস্থাগুলি নিশ্চিত করেছে যে, সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার ও বিচারের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রমাণ সংগ্রহ করা হবে এবং আইনের শাসন বজায় রাখতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করা হবে।



