খুলনা শহরের হেলাতলা রোডে অবস্থিত ইন্দ্রমোহন সুইটস, ১৩৬ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আজও ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি বিক্রি করে চলেছে। প্রতিষ্ঠাতা ইন্দ্রমোহন দে ১৮৯০-এর দশকে মানিকগঞ্জের ধূলসরা গ্রাম থেকে জীবিকার সন্ধানে খুলনা আসেন এবং গোলপাতার একচালা ঘরে দোকান শুরু করেন।
খুলনা ১৮৮২ সালে জেশোর জেলার অধীন থেকে আলাদা জেলা হয়ে ওঠার পর দ্রুত বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে, আর ভৈরব নদের ঘাটের নিকটবর্তী হেলাতলা রোডে এই মিষ্টির দোকান তার প্রথম ঠিকানা পায়। শহরের বাণিজ্যিক গতি পরিবর্তিত হলেও ইন্দ্রমোহন সুইটসের অবস্থান ও পরিবেশনা পদ্ধতি অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।
ইন্দ্রমোহন দে নিজের নামেই দোকানের নাম রাখেন এবং পাঁচটি ক্লাসিক মিষ্টি—রসগোল্লা, পানতুয়া, সন্দেশ, চমচম ও দানাদার—এর মাধ্যমে ব্যবসা চালু করেন। এই পাঁচটি পণ্যই আজ পর্যন্ত মেনুতে রয়েছে; নতুন কোনো আইটেম যোগ করা হয়নি, যা ‘কম কিন্তু উৎকৃষ্ট’ নীতির স্পষ্ট প্রকাশ।
দোকানের বিশেষত্ব হল মিষ্টি পরিবেশনে কলাপাতা ব্যবহার করা এবং চামচ না দিয়ে হাতে খাওয়ার প্রথা বজায় রাখা। বিক্রয় কেজি দরে নয়, বরং তৈরি সংখ্যার ভিত্তিতে হয়; প্রতিদিনের উৎপাদনই একই দিনে বিক্রি হয়ে যায়, ফলে কোনো স্টক বা বাকি মিষ্টি থাকে না।
এই মডেলটি নগদ প্রবাহকে স্থিতিশীল রাখে এবং ইনভেন্টরি খরচ কমিয়ে দেয়। তাছাড়া, দৈনিক উৎপাদন ও বিক্রয়ের সমন্বয় সরাসরি গ্রাহকের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখে, যা অতিরিক্ত উৎপাদন ও ক্ষতির ঝুঁকি হ্রাস করে।
ইন্দ্রমোহন সুইটসের গ্রাহকগোষ্ঠী ব্যাপক; শহরের সরকারি কর্মী, ব্যবসায়ী, শ্রমিকসহ সব স্তরের মানুষই এখানে আসেন। ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনা ও স্বাদই মূল আকর্ষণ, ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যেও স্থায়ী চাহিদা বজায় রয়েছে।
বাজারে আধুনিক মিষ্টি চেইন ও ফাস্ট ফুডের প্রবেশের পরেও এই ঐতিহ্যবাহী দোকান তার স্থান ধরে রেখেছে। কারণ, তার ব্র্যান্ডের মূল মূল্য হল শতাব্দীর বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা স্বাদ ও সেবা মান, যা গ্রাহকের বিশ্বাসকে শক্তিশালী করে।
তবে, আধুনিক প্যাকেজিং, ডিজিটাল মার্কেটিং ও বহিরাগত শাখা সম্প্রসারণের অভাব কিছুটা সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করে। নতুন প্রজন্মের ভোক্তা যদি সুবিধা ও বৈচিত্র্য চান, তবে ঐতিহ্যবাহী মডেলকে আধুনিকীকরণ করা প্রয়োজন হতে পারে।
ভবিষ্যতে ইন্দ্রমোহন সুইটসের জন্য দুইটি মূল দিক গুরুত্বপূর্ণ: প্রথমত, ঐতিহ্য বজায় রেখে প্যাকেজিং ও অনলাইন অর্ডারিং সিস্টেম যুক্ত করা, যাতে শহরের বাইরে থেকেও অর্ডার গ্রহণ করা যায়। দ্বিতীয়ত, সীমিত মেনুতে গুণগত মানের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে ব্র্যান্ডের প্রিমিয়াম অবস্থান বজায় রাখা।
সারসংক্ষেপে, ইন্দ্রমোহন সুইটসের ১৩৬ বছরের ব্যবসায়িক ধারাবাহিকতা তার সরল কিন্তু কার্যকর মডেল, নির্ভেজাল স্বাদ ও ঐতিহ্যবাহী সেবার ওপর নির্ভরশীল। বাজারের পরিবর্তনকে সাড়া দিয়ে আধুনিকীকরণে পদক্ষেপ নিলে এই ঐতিহ্যবাহী ব্র্যান্ডের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নিশ্চিত হবে।



