কুলের বাণিজ্যিক চাহিদা শীর্ষে, রাজশাহী ও ময়মনসিংহে উৎপাদন সর্বোচ্চ, আর কুমিল্লা তৃতীয় স্থানে রয়েছে। জাতীয় ফলের এই মৌসুম জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চলতে থাকে, যখন অন্যান্য দেশীয় ফলের সরবরাহ তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
কুলের মৌসুমের শুরু জানুয়ারিতে হয় এবং এপ্রিলে শেষ হয়; এই সময়ে ফলের স্বাদ টক‑মিষ্টি ও তাজা থাকে, ফলে বাজারে চাহিদা বাড়ে। বাড়ি-অফিসের দু’ই পরিবেশে কুল‑বরই খাওয়ার প্রবণতা গড়ে উঠেছে, যা উৎপাদনকারী কৃষকদের জন্য অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উপযুক্ত মাটি ও আবহাওয়ার সুবিধা থাকায় ২০২৪‑২৫ অর্থবছরে দেশব্যাপী কুলের মোট উৎপাদন ১,০১,৫২৩ টন রেকর্ড হয়েছে। এই পরিমাণের ভিত্তিতে, প্রতি কেজি ১০০ টাকা মূল্যে বিক্রি হলে বাজারের মোট মূল্য এক হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে।
বছরের শেষের দিকে প্রকাশিত পরিসংখ্যান দেখায়, পূর্ববর্তী অর্থবছর ২০২৩‑২৪-এ কুলের উৎপাদন ১,৮১৮ টন ছিল, আর ২০২২‑২৩ ও ২০২১‑২২ অর্থবছরে যথাক্রমে ৯৭ হাজার ও ৯৫ হাজার টন উৎপাদিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, সরকারি রেকর্ডের চেয়ে প্রকৃত উৎপাদন কিছুটা বেশি হতে পারে, কারণ কিছু ছোটখাটো উৎপাদক রেজিস্ট্রেশন ছাড়া কাজ করেন।
ঢাকার খুচরা বাজারে মৌসুমের শুরুর দিকে বড় আকারের কুলের দাম কেজি প্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা, আর ছোট আকারের দেশীয় বরই ১২০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। বিক্রেতারা অনুমান করছেন, সরবরাহ বাড়লে দাম সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে, তবে মৌসুমের শেষের দিকে আবার দাম বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।
মাগুরার নাসির হোসেনের মালিকানাধীন পাঁচ বিঘা জমিতে কুল চাষের খরচ প্রতি একরে প্রায় দুই লক্ষ টাকা, যার মধ্যে সেচ, সার ও শ্রমের ব্যয় অন্তর্ভুক্ত। বর্তমান বাজারে এক মণ (প্রায় ৪০ কেজি) কুলের দাম দুই হাজার পাঁচশ থেকে তিন হাজার টাকা, ফলে একর থেকে ছয় থেকে সাত লক্ষ টাকার বিক্রয় হয়। হিসাব অনুযায়ী, একর থেকে চার থেকে পাঁচ লক্ষ টাকার নিট লাভের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
কৃষিবিদদের মতে, দেশে সবচেয়ে বেশি চাষ করা হয় বনসুন্দরী, আপেল কুল, স্থানীয় ধারা ঢাকা‑১৯ এবং বাউকুল জাত। এই জাতগুলো উচ্চ ফলন ও ভাল গুণগত মানের জন্য জনপ্রিয়, যা রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
এক ফুট উচ্চতার গাছ থেকে এক বছরের মধ্যেই প্রায় বিশ কেজি পর্যন্ত কুল সংগ্রহ করা সম্ভব, এবং একর জমিতে গড়ে তিনশটি গাছ রোপণ করা হয়। গাছের গোড়া থেকে এক হাত পর্যন্ত ছাঁটাই করে বাকি শাখা ছাঁটা হয়, যাতে নতুন ডালপালা দ্রুত বেড়ে ওঠে এবং ফলের উৎপাদন বাড়ে।
প্রতিটি গাছের ফলন স্থিতিশীল রাখতে, পরের বছর গাছের গোড়া থেকে এক হাত পর্যন্ত ছাঁটাই করা হয়, এরপর অবশিষ্ট শাখা ছাঁটা হয়; এই পদ্ধতি নতুন শাখার বিকাশকে ত্বরান্বিত করে এবং ফলের গুণমান বজায় রাখে।
বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, কুলের দাম মৌসুমের মাঝামাঝি অতিরিক্ত সরবরাহের ফলে সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে চাহিদা স্থিতিশীল থাকলে দাম পুনরায় উর্ধ্বগামী হবে। এছাড়া, বৃষ্টিপাতের অনিয়মিততা ও রোগের প্রাদুর্ভাব উৎপাদনকে প্রভাবিত করতে পারে, তাই কৃষকদের সঠিক সেচ ও রোগনিয়ন্ত্রণে মনোযোগ দিতে হবে।
সারসংক্ষেপে, রাজশাহী ও ময়মনসিংহের উঁচু উৎপাদন, উচ্চ বাজারমূল্য এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদা কুলের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে উৎপাদন খরচ, মৌসুমী দামের ওঠাপড়া এবং প্রাকৃতিক ঝুঁকি বিবেচনা করে পরিকল্পিত চাষ ও বাজার কৌশল গড়ে তোলা জরুরি, যাতে কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয়েরই লাভ নিশ্চিত হয়।



