ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়া-উক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ২০তম নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ প্রস্তাব করেছে। এই পরিকল্পনায় রাশিয়ার তেল, গ্যাস, সামুদ্রিক সেবা এবং শ্যাডো ফ্লিটসহ আর্থিক ও ধাতু খাতের ওপর ব্যাপক সীমাবদ্ধতা আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজটি শুক্রবার ইউরোপীয় কমিশনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সম্মেলনে উপস্থাপিত হয়।
কমিশন উল্লেখ করেছে, নতুন ব্যবস্থা রাশিয়ার যুদ্ধনির্ভর অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়িয়ে মস্কোকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য রাখে। তেলের আয় কমে গেলে রাশিয়ার সামরিক ব্যয় সীমিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই প্রস্তাবের মাধ্যমে ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ার আয়-ব্যয়ের কাঠামোতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে চায়।
ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন ডার লেইন বলেছিলেন, ইউক্রেনের জনগণ নিজেদের রক্ষা করতে লড়াই করছে, আর রাশিয়া পরিকল্পিতভাবে বেসামরিক অবকাঠামো ও আবাসিক এলাকায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে রাশিয়াকে আলোচনার পথে আনতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, তিনি জোর দিয়ে বলেন। তার এই মন্তব্যের পরেই নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজের বিশদ বিবরণ প্রকাশিত হয়।
প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রাশিয়ার তেলবাহী জাহাজগুলোকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামুদ্রিক পরিষেবা থেকে বাদ দেওয়া অন্তর্ভুক্ত। এর অর্থ, কোনো ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান রাশিয়ার জাহাজকে বীমা, পরিবহন সহায়তা বা বন্দর সুবিধা প্রদান করবে না, যদি না জাহাজটি গি‑সেভেন নির্ধারিত মূল্যসীমা মেনে চলে। পূর্বে এই সীমা মেনে চলা জাহাজগুলোকে এসব সেবা দেওয়া হতো, কিন্তু নতুন নিয়মে এই ব্যতিক্রমটি বাতিল হবে।
এছাড়া নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজে রাশিয়ার ‘শ্যাডো ফ্লিট’—যে জাহাজগুলো আন্তর্জাতিক রেজিস্ট্রেশন ছাড়া কাজ করে—ও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ব্যাংকিং সিস্টেম, ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন এবং ধাতু রপ্তানি ক্ষেত্রেও কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে। এই সব ক্ষেত্রকে একসাথে লক্ষ্যবস্তু করে রাশিয়ার আর্থিক নেটওয়ার্ককে দুর্বল করা হবে।
ইউরোপীয় কমিশন আশা করে, গি‑সেভেন দেশগুলোর সমন্বয়ে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে রাশিয়ার জ্বালানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। তেল ও গ্যাসের রপ্তানি থেকে প্রাপ্ত আয় হ্রাস পেলে দেশের সামরিক সক্ষমতা হ্রাস পাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। ফলে রাশিয়া যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহে সমস্যার সম্মুখীন হবে।
সম্প্রতি রাশিয়ার তেলের মূল্যসীমা ব্যারেল প্রতি ৪৪ ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া এই নতুন সীমা অনুসরণ করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনও ব্যারেল প্রতি ৬০ ডলারের উচ্চ সীমা বজায় রেখেছে, যা গি‑সেভেনের মধ্যে একমাত্র ভিন্নতা। এই পার্থক্য ভবিষ্যতে সমন্বয় নিয়ে আলোচনার বিষয় হতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি গি‑সেভেনের সব দেশ এই নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজে একমত হয়, তবে রাশিয়ার তেল আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে এবং তার আন্তর্জাতিক আর্থিক অবস্থান আরও দুর্বল হবে। তাছাড়া রাশিয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, যা রাজনৈতিকভাবে তার অবস্থানকে আরও চাপের মুখে ফেলবে।
অবশেষে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রাশিয়াকে আলোচনার টেবিলে আনতে এবং ইউক্রেনের সার্বিক শান্তি প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে চায়। পরবর্তী ধাপ হিসেবে গি‑সেভেন দেশগুলোকে একত্রে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার সময়সূচি নির্ধারণ এবং রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হবে। এই প্রক্রিয়ার ফলাফল উক্রেনের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর উপর বড় প্রভাব ফেলবে।



