যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের আপটন শহরে অবস্থিত ব্রুকহেভেন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির রিলেটিভিস্টিক হেভি আয়ন কোলাইডার (RHIC) আজ শেষবারের মতো স্বর্ণ নিউক্লিয়াসের সংঘর্ষ সম্পন্ন করেছে। ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে চালু থাকা এই যন্ত্রটি এখন বন্ধের পথে, আর এর সাথে যুক্ত স্টার (STAR) ডিটেক্টরও তার শেষ ডেটা রেকর্ড করেছে।
স্টার ডিটেক্টর হল একটি ঘর-আকারের পার্টিকল সনাক্তকারী, যা স্বর্ণের পরমাণু নিউক্লিয়াসকে আলোর গতির কাছাকাছি গতি দিয়ে ধাক্কা দিয়ে সৃষ্ট অতি উষ্ণ ‘ফায়ারবল’ পর্যবেক্ষণ করত। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বিগ ব্যাংের পর মুহূর্তে সৃষ্ট কুয়র্ক-গ্লুয়ন প্লাজমা পুনরায় তৈরি করতে পারতেন।
ব্রুকহেভেনের গবেষকরা গত কয়েক দশকে এই কোলাইডার ব্যবহার করে মহাবিশ্বের প্রারম্ভিক অবস্থার ওপর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করেছেন। ২০০০-এর দশকে RHIC প্রথমবার কুয়র্ক-গ্লুয়ন প্লাজমা সনাক্ত করে, যা তার পর থেকে বহু নতুন বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করেছে। এই প্রাথমিক কণার স্যুপ থেকে নক্ষত্র, গ্যালাক্সি এবং শেষ পর্যন্ত মানবদেহের মৌলিক উপাদান গঠিত হয়।
স্টার ডিটেক্টরের শেষ মুহূর্তে বিজ্ঞানীরা স্ক্রিনে স্বর্ণ নিউক্লিয়াসের সংঘর্ষের রঙিন রেখা দেখেছেন, যা নীল, সবুজ ও সায়ান রঙে ঝলমল করছিল। কক্ষের মধ্যে হালকা গুঞ্জনকারী ফ্যানের শব্দ শোনা যাচ্ছিল, আর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে অ্যালার্মের নরম শব্দ শোনাচ্ছিল, যেন হাসপাতালের মনিটরের মতো।
ডিটেক্টরের কাজ শেষ হওয়ার পর, গবেষক অ্যালেক্স জেনচের মত এক বিজ্ঞানী এই মুহূর্তকে উদযাপন ও শোকের মিশ্রণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলছেন, এই যন্ত্রের অবসান একটি যুগের সমাপ্তি, তবে একই সঙ্গে নতুন গবেষণার সূচনা।
RHIC এর বন্ধের পেছনে মূল কারণ হল পরবর্তী প্রজন্মের কোলাইডার নির্মাণের প্রস্তুতি। বর্তমান কোলাইডারটি এখনো বিশ্বের একমাত্র উচ্চ শক্তির হেভি আয়ন কোলাইডার, তবে বিজ্ঞানীরা আরও শক্তিশালী ও বহুমুখী যন্ত্রের পরিকল্পনা করছেন, যা কণার পদার্থবিজ্ঞানের সীমা আরও প্রসারিত করবে।
নতুন প্রকল্পের জন্য ইতিমধ্যে গবেষণা দল ও সরকারী সংস্থা সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছে। লক্ষ্য হল এমন একটি যন্ত্র তৈরি করা, যা কুয়র্ক-গ্লুয়ন প্লাজমার গভীর গঠন বিশ্লেষণ এবং অজানা কণার অনুসন্ধানে সক্ষম হবে। এই উদ্যোগে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে।
RHIC এর শেষ ধাক্কা ২০২৫ সালের শেষের দিকে সম্পন্ন হয়, এবং এর পরবর্তী কোলাইডার প্রকল্পের অনুমোদন ও তহবিল সংগ্রহের কাজ চলমান। বিজ্ঞান সম্প্রদায়ের মধ্যে এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়ে, ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত পরীক্ষার মাধ্যমে মহাবিশ্বের গোপন রহস্য উন্মোচনের আশা করা হচ্ছে।
ব্রুকহেভেন ল্যাবরেটরির এই পদক্ষেপটি যুক্তরাষ্ট্রের পার্টিকল ফিজিক্স গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে। যদিও একক কোলাইডার বন্ধ হচ্ছে, তবে নতুন যন্ত্রের নির্মাণে অগ্রসর হওয়া মানে বিজ্ঞানীরা আরও শক্তিশালী সরঞ্জাম দিয়ে মৌলিক কণার আচরণ ও মহাবিশ্বের উৎপত্তি নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাবে।
পাঠকগণকে অনুরোধ করা হচ্ছে, এই বৈজ্ঞানিক পরিবর্তনের সময় ধৈর্য্য ও সমর্থন বজায় রাখতে, যাতে ভবিষ্যতে আরও আকর্ষণীয় ফলাফল দেখা যায়। আপনার মতামত বা প্রশ্ন থাকলে মন্তব্যে জানাতে পারেন।



