অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ গতকাল, ৫ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার, ১২৭ বছর পুরোনো ডাক আইন সংশোধনের জন্য নতুন “ডাকসেবা অধ্যাদেশ, ২০২৬” চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার ডিজিটাল যুগের চাহিদা মেটাতে ডাকসেবা ব্যবস্থার সমগ্র রূপান্তর নিশ্চিত করতে চায়। আইন পরিবর্তনের পেছনে আধুনিক ঠিকানা ব্যবস্থাপনা, ই-কমার্স সামঞ্জস্য এবং ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চালু থাকা পুরনো ডাক আইন এখন প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে না চলায় সংশোধনের দরকার দেখা দিয়েছে। সরকার এই পরিবর্তনকে দেশের পোস্টাল সেক্টরের দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর মূল পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। নতুন অধ্যাদেশে ডিজিটাল সেবা, অনলাইন পেমেন্ট এবং ই-স্ট্যাম্পিংকে আইনগত ভিত্তি প্রদান করা হয়েছে।
ডাকসেবা অধ্যাদেশের মূল দিকগুলোতে ডিজিটাল রূপান্তর, ই-কমার্স কমপ্লায়েন্স এবং আধুনিক ঠিকানা ব্যবস্থাপনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এতে ডাক ও কুরিয়ার ব্যবসা পরিচালনার জন্য বৈধ লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং লাইসেন্সবিহীন কার্যক্রমে সর্বোচ্চ দশ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা আরোপের বিধান যুক্ত হয়েছে, যা পূর্বের পঞ্চাশ হাজার টাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।
অধিকন্তু, প্রচলিত ডাকটিকিটের পাশাপাশি ই-স্ট্যাম্পিং বা ডিজিটাল ডাকটিকিট চালু করা হয়েছে। গ্রাহকরা অনলাইন পেমেন্টের মাধ্যমে কিউআর কোড বা বারকোডযুক্ত ডিজিটাল টিকিট পেতে পারবেন, যা সেবা গ্রহণে সময় সাশ্রয় করবে।
ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার জন্য নতুন আইনে “ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫” অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। লজিস্টিক অপারেটরদের গ্রাহকের তথ্য এনক্রিপশনসহ শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সকল বাণিজ্যিক অপারেটরের আন্তঃপরিচালন নিশ্চিত করতে সরকার একটি কেন্দ্রীয় লজিস্টিক্স ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম চালু করবে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্যাকেজের অবস্থান রিয়েল-টাইমে অনুসরণ করা যাবে এবং ডেটা শেয়ারিং সহজ হবে।
ডিজিটাল ঠিকানা ব্যবস্থাপনায় নাগরিকদের ঠিকানার ডিজিটাল আর্কাইভের পাশাপাশি ফ্যামিলি-ট্রি ম্যাপিং ও জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নদীভাঙন, চর বিলীন বা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভূমি পুনরুদ্ধারের মতো পরিস্থিতিতে ঠিকানা পুনঃপ্রতিষ্ঠা সহজ হবে।
কিছু লজিস্টিক ও ব্যবসা সংস্থা নতুন নিরাপত্তা ও ডেটা সুরক্ষা মানদণ্ডের বাস্তবায়ন খরচ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা দাবি করে যে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা ছাড়া নতুন বিধানগুলো কার্যকর করা কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে, ডিজিটাল সেবার সুবিধা থেকে উপকৃত হতে আশা করা নাগরিক ও উদ্যোক্তারা এই পরিবর্তনকে সেবা গুণগত মান ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে, এই আইন পরিবর্তন অন্তর্বর্তী সরকারের ডিজিটাল রূপান্তরের অগ্রাধিকারকে স্পষ্ট করে এবং আসন্ন নির্বাচনের পূর্বে জনমত গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে। সরকার এই পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রযুক্তি-সচেতন তরুণ ভোটারদের সমর্থন অর্জনের লক্ষ্য রাখতে পারে।
পরবর্তী ধাপে, নতুন অধ্যাদেশের কার্যকরী নির্দেশনা ও নিয়মাবলী আগামী কয়েক মাসের মধ্যে প্রকাশের কথা জানানো হয়েছে। বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগের জন্য একটি বিশেষ তদারকি কমিটি গঠন করা হবে, যা সময়মতো সমস্যার সমাধান ও সংশোধন নিশ্চিত করবে।



