শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি তার নতুন ইশতেহার উন্মোচন করে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনী সময়ে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, দ্বিকক্ষীয় সংসদ এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমা সহ ৩৫টি সংস্কারমূলক পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। এই প্রস্তাবনাগুলো ১৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে স্বাক্ষরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ এবং দলের ৩১ দফার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের লক্ষ্য রাখে।
ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ সংবিধানের মূল নীতিমালা হিসেবে পুনঃস্থাপন করা হবে। এছাড়া, সংবিধানে ফ্যাসিস্ট শাসনের সময় বাতিল করা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরায় চালু করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হল ‘নির্বাচনকালীন দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা প্রবর্তন, যা নির্বাচনকালে সরকারী ক্ষমতা নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করবে এবং বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রপতি এই ব্যবস্থার বাইরে থাকবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো ও কার্যপ্রণালী পরবর্তী সংসদে আলোচনা করে, স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে চূড়ান্ত করা হবে।
দ্বিকক্ষীয় সংসদ গঠনের প্রস্তাবও ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত। দলটি যুক্তি দিয়েছে, উভয় চেম্বার থাকলে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও সমন্বিত হবে এবং জনমতের বৈচিত্র্যকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করা সম্ভব হবে। এতে জাতীয় সংসদে একটি উপসভার ভূমিকা যুক্ত হবে, যার সদস্যরা বিভিন্ন পেশা ও অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করবে।
প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মেয়াদ নির্দিষ্ট করার বিষয়েও দলটি স্পষ্ট করেছে যে, একক মেয়াদে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর এবং পুনর্নির্বাচনের সুযোগ থাকবে না। এই ধারা অনুসারে, দীর্ঘমেয়াদী একনায়ক শাসন রোধ করা এবং নেতৃত্বের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।
বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য সংবিধানে সংশোধনী আনা হবে। এতে বিচারিক নিয়োগ, পদোন্নতি এবং বিচারের স্বায়ত্তশাসনকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করা হবে। দলটি জোর দিয়ে বলেছে, স্বতন্ত্র বিচার ব্যবস্থা গণতন্ত্রের ভিত্তি এবং এর সুনির্দিষ্ট রূপায়ণই দেশের আইনি কাঠামোকে শক্তিশালী করবে।
ইশতেহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সংবিধানের মূল নীতিতে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন করা হবে, যা দেশের ধর্মীয় ও সাংবিধানিক পরিচয়কে একত্রে সংহত করবে। এছাড়া, ৩১ দফার ভিত্তিতে অন্যান্য প্রয়োজনীয় সংস্কারও করা হবে, যার মধ্যে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক দলগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ঘোষণা করেছে। দলটি দাবি করে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সংস্কারমূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
অন্যদিকে, বর্তমান সরকার এই প্রস্তাবনাগুলোকে সংবিধানবিরোধী এবং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় হুমকি হিসেবে সমালোচনা করেছে। সরকারী সূত্রে বলা হয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা দেশের সংবিধানিক কাঠামোকে দুর্বল করবে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করবে। এছাড়া, দ্বিকক্ষীয় সংসদ গঠনের পরিকল্পনাকে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এবং প্রশাসনিক জটিলতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়েছে।
বিএনপি এই সমালোচনার প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, তাদের প্রস্তাবনা দেশের দীর্ঘমেয়াদী গণতান্ত্রিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় এবং সংবিধানের মূল নীতিগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে গৃহীত। দলটি যুক্তি দিয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নির্বাচনকালে রাজনৈতিক পক্ষপাত দূর করবে এবং স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করবে।
সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ৩৫টি পয়েন্টের মধ্যে কিছু মূল বিষয় সংক্ষেপে তুলে ধরা যায়: ১) জুলাই জাতীয় সনদের ধারাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়ন, ২) ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ সংবিধানে পুনঃস্থাপন, ৩) নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, ৪) দ্বিকক্ষীয় সংসদ গঠন, ৫) প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমা, ৬) বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, ৭) অন্যান্য ২৯টি সংস্কারমূলক ধারা।
দলটি উল্লেখ করেছে, এই সংস্কারগুলো ধাপে ধাপে এবং পরবর্তী সংসদে আলোচনা করে চূড়ান্ত করা হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা, দ্বিকক্ষীয় সংসদের কাঠামো এবং অন্যান্য সংবিধান সংশোধনী সংক্রান্ত বিশদ বিবরণ পরবর্তী আইনসভার আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি আশা প্রকাশ করেছে, এই ইশতেহার দেশের রাজনৈতিক সংস্কারকে ত্বরান্বিত করবে এবং গণতন্ত্রের ভিত্তিকে মজবুত করবে। দলটি ভোটারদের কাছে আহ্বান জানিয়েছে, আসন্ন নির্বাচনে তাদের প্রস্তাবনা সমর্থন করে দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে অংশ নিতে।



