চীন সরকার ৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে ইসরাইলের অধিকৃত অঞ্চলগুলোকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বা লাল তালিকাভুক্ত করে, ফলে ওই এলাকায় কোনো নতুন বিনিয়োগ বা আর্থিক লেনদেন করা কার্যত নিষিদ্ধ করেছে। এই সিদ্ধান্তের প্রমাণ চীনা বিনিয়োগ তহবিলের এক মামলা নথিতে পাওয়া যায়, যেখানে গাজা উপত্যকায় চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বেইজিংয়ের কঠোর পদক্ষেপ প্রকাশ পেয়েছে।
ইসরাইলের উত্তরে লেবানন সীমান্তের নিকটে অবস্থিত কিবুতজ হানিতার একটি লেন্স উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের শেয়ার লেনদেন নিয়ে ‘ব্যালে ভিশন’ নামে চীনা নিয়ন্ত্রিত তহবিলের বিরুদ্ধে টেল আবিব জেলা আদালতে প্রায় ১১ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার নথিপত্রে ব্যালে ভিশনের একটি চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, চীনের সরকার ইসরাইলের অধিগ্রহণকৃত এলাকাগুলোকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং এই নিষেধাজ্ঞা বজায় থাকলে নতুন কোনো বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়।
চিঠিতে আরও জানানো হয়েছে যে, লেন্স উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি গত তিন বছরে প্রায় ১৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি এবং ৪ মিলিয়ন ডলার ঋণের সম্মুখীন হয়েছে। আর্থিক অবস্থা এতটাই দুর্বল যে, চুক্তি অনুযায়ী বাকি শেয়ার কেনা এখনো সম্ভব হচ্ছে না। এই আর্থিক চাপের ফলে চীনা তহবিলের উপরও চাপ বাড়ছে, কারণ তারা বিনিয়োগের রিটার্ন নিশ্চিত করতে পারছে না।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, গাজা সংঘাতের পাশাপাশি ইসরাইলের তাইওয়ানের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা চীনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও খারাপ করেছে। চীন পূর্বে ইসরাইলকে সতর্ক করে ছিল যে, তাইওয়ানকে কোনো সামরিক প্রযুক্তি বা দক্ষতা সরবরাহ করা উচিত নয়। তবে ইসরাইলের এই সতর্কতা উপেক্ষা করে তাইওয়ানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা উন্নয়নে সহায়তা করার অভিযোগ উঠেছে।
চীনের এই নিষেধাজ্ঞা ইসরাইলের অর্থনৈতিক পরিবেশে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ তালিকাভুক্ত এলাকায় বিনিয়োগ বন্ধ হওয়ায়, স্থানীয় শিল্প ও সেবা খাতের জন্য তহবিলের প্রবাহ কমে যাবে। বিশেষ করে লেন্স উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটির মতো ক্ষতিগ্রস্ত কোম্পানিগুলো আর্থিক সংকটে পড়তে পারে, যা কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি আয়ের ওপর প্রভাব ফেলবে।
ইসরাইলের সরকার এখন পর্যন্ত এই চীনা সিদ্ধান্তের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসরাইলের অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর এই পদক্ষেপের প্রভাব কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। গাজা উপত্যকায় চলমান সংঘাতের ফলে ইতিমধ্যে মানবিক সংকট বাড়ছে, আর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে।
বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিতে চীনের এই পদক্ষেপ একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বিনিয়োগের ঝুঁকি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করবে। বিশেষ করে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ তালিকাভুক্ত অঞ্চলে প্রকল্প চালু করার আগে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন হবে।
পরবর্তী সময়ে চীন ও ইসরাইলের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এই নিষেধাজ্ঞা কীভাবে সমন্বয় করা হবে, তা আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও নিরাপত্তা নীতির ওপর প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে, গাজা সংঘাতের সমাধান এবং তাইওয়ানের সঙ্গে ইসরাইলের সামরিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা উভয় দেশের কূটনৈতিক কৌশলকে প্রভাবিত করবে।
এই পরিস্থিতিতে ইসরাইলের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকরা চীনের নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় বিকল্প তহবিলের সন্ধান এবং স্থানীয় শিল্পের পুনরুজ্জীবনের জন্য পদক্ষেপ নিতে পারেন। অন্যদিকে, চীনও মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং তার বিনিয়োগের স্বার্থ রক্ষা করতে কূটনৈতিক সমঝোতা অনুসন্ধান করতে পারে।



