শুক্রবার বিকেলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি তারেক রহমানের নেতৃত্বে ইশতেহার উন্মোচিত করে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে নির্বাচনী পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। দলটি পাঁচটি ভাগে বিভক্ত নীতি কাঠামো উপস্থাপন করে, যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, সামাজিক কল্যাণ, অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন এবং সংস্কৃতি‑ক্রীড়া‑ধর্ম সংক্রান্ত লক্ষ্যসমূহ অন্তর্ভুক্ত। ইশতেহারটি ভোটারদের কাছে পার্টির দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রতিশ্রুতি স্পষ্ট করার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রথম অধ্যায়ে রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সংবিধান সংশোধন, জাতীয় ঐক্য ও সুশাসনকে মূল লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বিচারবিভাগের স্বতন্ত্রতা, পুলিশ সংস্কার এবং স্থানীয় স্বশাসনের শক্তিশালীকরণও উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। দারিদ্র্য নির্মূল, সামাজিক সুরক্ষা, নারী ক্ষমতায়ন, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, দেশব্যাপী কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, শ্রমিক ও প্রবাসী কল্যাণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয়কে অগ্রগণ্য করা হয়েছে।
তৃতীয় অধ্যায়ে ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়েছে। বিনিয়োগ বাড়ানো, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কার, শিল্প ও সেবা খাতের উন্নয়ন, বিদ্যুৎ‑জ্বালানি, তথ্য‑প্রযুক্তি, পরিবহন ব্যবস্থা, সৃজনশীল অর্থনীতি এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা জোরদার করার কথা বলা হয়েছে।
চতুর্থ অধ্যায়ে অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী গড়ে তোলার পরিকল্পনা, হাওর‑বাঁওড় ও উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়ন, নগরায়ণ, সাশ্রয়ী আবাসন, নিরাপদ ও টেকসই ঢাকার নির্মাণ এবং পর্যটন খাতের বিকাশকে মূল অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পঞ্চম অধ্যায়ে ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি সংক্রান্ত অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছে। ধর্মীয় সম্প্রীতি, পাহাড়ি ও সমতল জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষা, ক্রীড়া উন্নয়ন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, শিল্প‑সংস্কৃতি চর্চা এবং নৈতিকতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ইত্যাদি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ইশতেহারে উল্লেখিত নয়টি প্রধান প্রতিশ্রুতির মধ্যে অন্যতম হল প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে এবং পরবর্তী সময়ে এই পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যান্য প্রধান প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে বেকারত্ব কমাতে যুব কর্মসংস্থান প্রকল্প, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবার সর্বজনীনতা, শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, পরিবেশ সংরক্ষণে কঠোর পদক্ষেপ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ। এসব নীতি একসাথে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তুলতে চাওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য বিরোধী গোষ্ঠী ইশতেহারকে রাজনৈতিক চালনা হিসেবে উল্লেখ করে, বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও আর্থিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তারা দাবি করেছে যে নির্বাচনের আগে প্রকাশিত নীতি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় বাজেট ও প্রশাসনিক কাঠামো এখনও স্পষ্ট নয়।
বিএনপি পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়েছে যে ইশতেহারটি দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের রোডম্যাপ এবং নির্বাচনের পর দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত ও আর্থিক ব্যবস্থা গৃহীত হবে। দলটি ভোটারদের কাছে সরাসরি পৌঁছানোর জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ সহ বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণ প্রকল্প চালু করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বিশ্লেষকরা ইশতেহারকে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন গতিবিদ্যা যোগ করার সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন। যদি দলটি নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সিট জিতে, তবে এই নীতি গুলো সরকারী এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হতে পারে। অন্যদিকে, নির্বাচনের ফলাফল অনিশ্চিত থাকায় ইশতেহারের বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হবে তা এখনও নির্ধারিত হয়নি।
সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি পাঁচটি অধ্যায়ে গঠিত ইশতেহার দিয়ে নির্বাচনী মঞ্চে নতুন দৃষ্টিকোণ উপস্থাপন করেছে এবং ভোটারদের কাছে তার নীতি ভিত্তিক প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছে। পরবর্তী সময়ে এই নীতিগুলোর বাস্তবায়ন ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



