ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর হোটেল শেরাটনে অনুষ্ঠিত ইশতেহার ঘোষণায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (বিএমজিএম) ক্ষমতায় এলে দেশের পররাষ্ট্রনীতি কী হবে তা বিশদভাবে জানায়। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান ৪১ দফা ইশতেহার উপস্থাপন করেন, যেখানে ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বিএমজিএমের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার মর্যাদা ও বাংলাদেশের নাগরিকদের পাসপোর্টের র্যাঙ্কিং উঁচু করার জন্য পদক্ষেপ নেবে। এ লক্ষ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, কনসুলার সেবা উন্নয়ন এবং বহুপাক্ষিক সংলাপকে শক্তিশালী করা হবে বলে দলটি জানায়।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে, দলটি ভারত, ভুটান, নেপাল, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও থাইল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করে পারস্পরিক সম্মান, ন্যায্যতা এবং শান্তির ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেয়। এই দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা উল্লেখ করা হয়েছে।
মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিয়ে, দলটি ইসলামী দেশগুলোর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধতা ও সমন্বয় বাড়ানোর লক্ষ্য প্রকাশ করে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, কানাডা এবং অন্যান্য উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপ স্থাপন করে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করা হয়েছে।
দক্ষিণ আমেরিকা, পূর্ব ইউরোপ এবং আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণের জন্যও দলটি নির্দিষ্ট কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা করেছে। এ ধরণের বহুমুখী নীতি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা শক্তিশালী করার উদ্দেশ্য বহন করে।
বিএমজিএমের এই ঘোষণার পর, দেশের প্রধান বিরোধী দলগুলো থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করেছেন যে, পররাষ্ট্রনীতির এই দিকটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে এবং বাস্তবায়নে পার্টির অভ্যন্তরীণ কাঠামো ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি প্রভাব ফেলতে পারে।
ইশতেহার অনুষ্ঠানে দলটি উল্লেখ করে, ক্ষমতায় এলে দেশের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের স্বীকৃতি ও মর্যাদা বাড়াতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ত্বরান্বিত করা হবে। এ জন্য কূটনৈতিক মিশনগুলোর কার্যক্রম পুনর্গঠন, কনসুলার সেবা দ্রুততর করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য নীতি নির্ধারণের ওপর জোর দেওয়া হবে।
বিএমজিএমের এই নীতি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতিমূলক কাজও ত্বরান্বিত হয়েছে। দলটি ৪১ দফা ইশতেহার মাধ্যমে তার ভোটার ভিত্তি সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিদেশি ভোটারদের কাছে তার দৃষ্টিভঙ্গি পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।
দলটির মুখপাত্ররা উল্লেখ করেন, ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সমঝোতা করা হবে, যাতে সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক লেনদেন এবং পরিবহন সংযোগে উন্নতি সাধন করা যায়। এই নীতি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় অবদান রাখবে।
বিএমজিএমের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ককে শক্তিশালী করার জন্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংলাপের মাধ্যমে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে, উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়িয়ে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়া হবে।
দলটি উল্লেখ করে, বিদেশি মুদ্রা সংগ্রহের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যটনকে উত্সাহিত করার জন্য ভিসা নীতি সহজ করা এবং পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা হবে। এ ধরনের নীতি দেশের অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করবে।
অবশেষে, দলটি বলেছে, ক্ষমতায় এলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দিতে চায়। এ জন্য কূটনৈতিক মিশনের সংখ্যা বাড়ানো এবং কূটনৈতিক প্রশিক্ষণকে আধুনিকীকরণ করা হবে।
নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, এই নীতি ঘোষণার বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হবে তা দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল থাকবে। বর্তমানে, দলটি তার ইশতেহারকে ভোটারদের কাছে উপস্থাপন করার পর্যায়ে রয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে।



