চীনের তরুণ শিল্পী ভিভ লি তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দুই পাহাড় আমার বুকের ওপর’ নিয়ে ১৩ ফেব্রুয়ারি বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্যানোরামা ডকুমেন্টে বিভাগে বিশ্বপ্রিমিয়ার করেছে। কোভিড‑১৯ মহামারীর পর বার্লিনে আটকে থাকা সময়ে তিনি শহরের বিকল্প সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন এবং সেই অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে চলচ্চিত্রটি গড়ে তুলেছেন।
ভিভ লি নিজে চীনা শিল্পের প্রতি আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন, তবে বার্লিনের উন্মুক্ত পরিবেশে তিনি নিজেকে ‘মিসফিট’ হিসেবে অনুভব করেন। এই দ্বন্দ্ব তাকে দুইটি ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে দোলায়মান অবস্থায় ফেলেছে; একদিকে বেইজিংয়ের পারিবারিক শৃঙ্খলা, অন্যদিকে বার্লিনের স্বাধীনতা ও বিকল্পতা। তার এই অভিজ্ঞতা চলচ্চিত্রের শিরোনামেও প্রতিফলিত হয়েছে, যেখানে দুইটি ‘পাহাড়’ মানসিক ও সাংস্কৃতিক বোঝা নির্দেশ করে।
‘দুই পাহাড় আমার বুকের ওপর’ একটি জেনার‑বাঁধা না করা কাজ, যেখানে ডকুমেন্টারি ও ফিকশন উভয়ের উপাদান মিশ্রিত হয়েছে। গল্পের মূল চরিত্র লি, যিনি চীনের পরিবারিক প্রত্যাশা এবং বার্লিনের অপ্রচলিত জীবনধারার মধ্যে সমন্বয় খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। তিনি নিজের পরিচয়, আত্মবিশ্বাস এবং বৈশ্বিক সমাজে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, যা চলচ্চিত্রের মূল থিম হিসেবে উঠে আসে।
বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে প্যানোরামা ডকুমেন্টে এই কাজের বিশ্বপ্রিমিয়ার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র জগতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। প্যানোরামা ডকুমেন্ট বিভাগটি মূলত সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক বিষয়বস্তুর উপর ভিত্তি করে তৈরি চলচ্চিত্রগুলোকে সমর্থন করে, এবং লির কাজ এই মানদণ্ডে পুরোপুরি মানানসই। উৎসবের আয়োজকরা চলচ্চিত্রটি ‘সাংস্কৃতিক টানাপোড়েনকে সৃজনশীল অনুসন্ধানে রূপান্তরিত’ বলে প্রশংসা করেছেন।
চলচ্চিত্রের সংক্ষিপ্তসার অনুযায়ী, লি বার্লিনের বিকল্প সংস্কৃতির মধ্যে নিজেকে পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করেন, একই সঙ্গে চীনের পরিবারিক প্রত্যাশা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করেন। তিনি নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে গিয়ে নিজের সম্পর্কে, বিশ্বের সম্পর্কে এবং চীনের প্রতি নিজের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে ক্রমাগত পুনর্বিবেচনা করেন। এই প্রক্রিয়ায় তিনি আরও বেশি হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতি পেতে শুরু করেন, যা চলচ্চিত্রের নাটকীয় গতি বাড়িয়ে দেয়।
‘দুই পাহাড়’ দর্শকদের প্রশ্ন করে: অন্য কোনো সংস্কৃতি শিখে নেওয়ার পর নিজের মূল সংস্কৃতির সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্য বজায় রাখা যায়? লি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিভিন্ন অদ্ভুত ও স্বপ্নময় দৃশ্যের মাধ্যমে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করেন। উদাহরণস্বরূপ, এক দৃশ্যে তিনি নগ্ন অবস্থায় সাঁতার কাটছেন, যা মানবিক স্বচ্ছতা ও আত্মঅন্বেষণের প্রতীক হিসেবে কাজ করে।
চলচ্চিত্রের এক্সক্লুসিভ ট্রেলারটি সিরিয়াস, হাস্যকর এবং অপ্রচলিত মুহূর্তের মিশ্রণ দেখায়। ট্রেলারে বার্লিনের রাস্তায় রঙিন গ্রাফিতি, বিকল্প সঙ্গীতের সুর এবং লির অদ্ভুত পোশাকের দৃশ্যগুলো একসাথে মিশে একটি অনন্য ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা তৈরি করে। এই ভিজ্যুয়াল স্টাইলটি চলচ্চিত্রের মূল থিমকে সমর্থন করে, যেখানে পরিচয় ও অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
লির নিজের কথায়, বার্লিনের ‘হ্যাট’ ধীরে ধীরে পরতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন যে অন্যকে গ্রহণ করার প্রচেষ্টা ও স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তার মনের ওপর ভারী চাপ সৃষ্টি করেছে। এই অভিজ্ঞতা তাকে নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করতে এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, এই প্রক্রিয়ায় তিনি নিজের ‘বুকের ওপরের দুই পাহাড়’কে সামলাতে শিখেছেন।
‘দুই পাহাড় আমার বুকের ওপর’ কেবল একটি ব্যক্তিগত আত্মঅন্বেষণের গল্প নয়, বরং গ্লোবালাইজড বিশ্বে বহু সংস্কৃতির সংযোগ ও সংঘর্ষের প্রতিফলন। লি এই কাজের মাধ্যমে দেখাতে চান, কীভাবে একাধিক সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা একসাথে বসে একটি নতুন পরিচয় গঠন করে। চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক দর্শকদের জন্য একটি দরজা খুলে দেয়, যেখানে তারা নিজের সাংস্কৃতিক মূল্যের পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে।
বার্লিনে এই চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ার লি এবং তার মতোই বহু তরুণ শিল্পীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি দেখায় যে সীমানা অতিক্রম করে সৃষ্টিশীলতা ও আত্মপ্রকাশের নতুন পথ খোলা সম্ভব। ভবিষ্যতে লি আরও আন্তর্জাতিক প্রকল্পে কাজ করার পরিকল্পনা করছেন, যা তার শিল্পী সত্তাকে আরও বিস্তৃত করবে। এই চলচ্চিত্রটি তার সৃজনশীল যাত্রার সূচনা মাত্র, এবং এটি গ্লোবাল শিল্প জগতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করবে।



