রংপুরের পীরগাছা‑কাউনিয়া (রংপুর‑৪) আসনে আলু চাষীর আর্থিক অবস্থা ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। গত বছর ১০ একর জমিতে আলু চাষে মাসুম মিয়া প্রায় ১৮ লক্ষ টাকার ক্ষতি ভোগ করেন, ফলে তিনটি গরু বিক্রি করে দেন এবং এই বছর চাষের পরিমাণ ৩.৪৮ একরে কমিয়ে নেন। দাম ঠিক না হলে তিনি আবার ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন, এ কথা তিনি তালতলা বাজারে উপস্থিত পাঁচজন আলু চাষীর সঙ্গে ভাগ করে নেন।
তালতলা বাজারটি রংপুর‑সুন্দরগঞ্জ সড়কের পাশে অবস্থিত এবং এই এলাকায় এনসিপি‑এর দলীয় সদস্যসচিব ও ১১‑দলীয় ঐক্যের প্রার্থী আখতার হোসেন, বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ এমদাদুল হক এবং জাতীয় পার্টির আবু নাসের শাহ মো. মাহবুবার রহমান প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন। অন্যান্য দলের প্রার্থী থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই তিনজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
কৃষকরা জানিয়েছেন, প্রার্থীরা ভোটের জন্য প্রচারণা চালাচ্ছেন, তবে আলু চাষীর সমস্যার সমাধান নিয়ে কোনো আলোচনা হচ্ছে না। পীরগাছা এলাকার বেশিরভাগ গ্রাম—ছোট কল্যাণী, স্বচাষ, বড়দরগা, কালুক পষুয়া, বড় হাজরা, নব্দিগঞ্জ—এখানে আলু চাষই প্রধান আয়। স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ আলু উৎপাদনে যুক্ত।
ছোট কল্যাণী গ্রাম থেকে চাষী ছলিম উদ্দীন বলেন, “প্রার্থীরা শুধু ভোট চাইছে, আলু নিয়ে কোনো কথা বলছে না, আমাদের দুঃখ শোনে না।” তিনি গত বছর প্রায় দেড় লাখ টাকার ক্ষতি করেছেন এবং একটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে জীবিকা চালাচ্ছেন। তার আলু ফসলের কাটার সময় এখনো ৩০‑৪০ দিন বাকি, ফলে তার আর্থিক অবস্থা অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।
রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট কৃষিজমি ১,৮৯,৫১৪ হেক্টর, যার মধ্যে ২৮‑২৯ শতাংশ জমিতে আলু চাষ হয়। গত তিন বছর রংপুর ৬৪ জেলার মধ্যে আলু উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে। তবে এই বছর আলু চাষের আয়তন হ্রাস পেয়েছে; পূর্ববছরে ৬৬,২৮০ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছিল, আর এই বছর তা কমে ৫৪,৫০০ হেক্টরে নেমে এসেছে, অর্থাৎ ১১,৭৮০ হেক্টর হ্রাস।
আলু চাষের আয়তন হ্রাসের প্রধান কারণ হল বাজারে দাম স্থিতিশীল না থাকা এবং ক্রেতা চাহিদার অনিশ্চয়তা। ফলস্বরূপ, চাষীরা উৎপাদন কমিয়ে ঝুঁকি হ্রাসের চেষ্টা করছেন, তবে এতে আয়ের পরিমাণও কমে যাচ্ছে। বিক্রয়মূল্য না বাড়লে, ঋণ ও ঋণসামগ্রীর বোঝা বাড়বে, যা গ্রামীণ আর্থিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
নির্বাচনী সময়ে প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব নীতি প্রয়োগের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যদি সরকার বা স্থানীয় প্রশাসন আলু চাষীর জন্য মূল্য স্থিতিশীলকরণ, সঞ্চয় ও ঋণ সুবিধা প্রদান না করে, তবে উৎপাদন হ্রাসের প্রবণতা অব্যাহত থাকবে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, আলু বাংলাদেশের অন্যতম মৌলিক শাকসবজি, এবং এর চাহিদা মৌসুমী পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ বাজারের দামের পার্থক্য কমে গেলে, চাষীর মুনাফা হ্রাস পাবে। তাই সরকারী হস্তক্ষেপ না হলে, রংপুরের আলু উৎপাদন ও কৃষি আয়তনের হ্রাসের ঝুঁকি বাড়বে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, আলু চাষের ক্ষতি সরাসরি গ্রামীণ ভোগ্যপণ্য বাজারে প্রভাব ফেলবে। চাষীর আয় কমে গেলে, স্থানীয় ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাবে, যা ছোট ব্যবসা ও সেবা খাতের বিক্রয়েও প্রভাব ফেলতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, রংপুরের আলু চাষীরা আর্থিক সংকটে আছেন এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি তাদের সমস্যার সমাধান দিতে পারছে না। বাজারের দাম স্থিতিশীল না হলে, চাষের পরিমাণ কমে যাবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ভবিষ্যৎ প্রবণতা নির্ধারণে দেখা যায়, যদি সরকারী সহায়তা না করা হয়, তবে আলু চাষের আয়তন কমে যাবে এবং ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে। তাই নীতি নির্ধারকদের দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে মূল্য স্থিতিশীলতা, ঋণ হ্রাস এবং বাজার সংযোগ উন্নত করা জরুরি।
সংক্ষেপে, রংপুরে আলু চাষের আর্থিক চাপ বাড়ছে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়ায় চাষীর হতাশা বাড়ছে, এবং বাজারের অস্থিরতা উৎপাদন হ্রাসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এই পরিস্থিতি সমাধানের জন্য তাত্ক্ষণিক নীতি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।



