২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের পরপরই দেশের বিভিন্ন মিডিয়া সংস্থা ভোটের অস্বাভাবিকতা ও সহিংসতার তথ্য প্রকাশ করে। উত্তরা নির্বাচনী এলাকার (ঢাকা‑১৮) কাওলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের ক্ষেত্রে একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভোটগ্রহণের দিন পুরো কেন্দ্রটি বেশিরভাগ সময় ফাঁকা ছিল। শেষ দেড় ঘণ্টায় মাত্র এক-দুই হাজার ভোটারই উপস্থিত হয়, তবু কেন্দ্রে মোট ১,৫৮৩টি ভোটের রেকর্ড দেখানো হয়।
এই তথ্যের পরের দিন প্রধান শিরোনাম “জাল ভোট, কলঙ্কিত নির্বাচন” হয়ে ওঠে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১৫৩টি আসনের অর্ধেকের বেশি (৮১টি) কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই একপক্ষীয়ভাবে জয়ী হয়। একই সঙ্গে ভোটের দিন ব্যাপক সহিংসতা দেখা দেয়; অন্তত ১৯ জনের প্রাণহানি রেকর্ড করা হয়েছে। ভোটের আগের রাত ৩ জানুয়ারি থেকে ভোটের দিন রাত ১০টা পর্যন্ত ১১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, যেগুলোই ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। অতিরিক্তভাবে প্রায় ১০০টি কেন্দ্রে হামলা ও ব্যালট ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে।
এই নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পেছনে রাজনৈতিক পার্থক্যও স্পষ্ট। ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ ও তার গৃহপালিত দলগুলো এই নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়, যেখানে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ভোট থেকে বিরত থাকে। তদুপরি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে বিরোধী দলগুলোকে ভোট থেকে দূরে রাখার কৌশল গ্রহণ করা হয়। ২০১৩ সালের ১০ অক্টোবরের একটি জনমত জরিপে দেখা গিয়েছিল যে, ৫০.৩% মানুষ বিএনপিকে ভোট দিতে ইচ্ছুক, আর ৩৫.৫% মানুষ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে। এই ফলাফলকে সামনে রেখে সরকার একতরফা ও পাতানো নির্বাচনের পথে অগ্রসর হয়।
বিশ্লেষকরা এই ঘটনাকে “গণতন্ত্রের মুখোশে স্বৈরতন্ত্রের” রূপান্তর হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটির ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের গবেষক আন্দ্রেস শেডলার ২০০২ সালে প্রকাশিত “দ্য মেনু অব ম্যানিপুলেশন” নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলগুলো স্বৈরতন্ত্রের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে। ২০১৪ সালের এই নির্বাচনও একই ধাঁচের কৌশল ব্যবহার করে, যেখানে ভোটের স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে, এই নির্বাচনের পরবর্তী পর্যায়ে বিরোধী দলগুলো পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের ফলে রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করার দাবি বাড়বে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোও এই নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যা দেশের আন্তর্জাতিক চিত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।
অবশেষে, ২০১৪ সালের নির্বাচনের পরবর্তী বিশ্লেষণ দেখায় যে, ভোটের সংখ্যা ও ফলাফল নিয়ে প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে বড় পার্থক্য, সহিংসতার মাত্রা এবং রাজনৈতিক একতরফা সিদ্ধান্তের সমন্বয় দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। এই ঘটনাগুলো ভবিষ্যতে নির্বাচনী সংস্কার, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনা এবং রাজনৈতিক সংলাপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরবে।



