যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে একটি নৌযানের ওপর চালানো হামলায় দুইজনের মৃত্যু ঘটেছে বলে জানিয়েছে। এই ঘটনাটি শুক্রবার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সামনে প্রকাশ পায়। সংশ্লিষ্ট নৌযানটি ও নিহতদের পরিচয় সম্পর্কে এখনও স্পষ্টতা নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন কমান্ড (সাউথকম) একটি বিবৃতিতে উল্লেখ করে, লক্ষ্যবস্তু নৌযানটি মাদক ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত ছিল এবং অভিযানে দুজনকে মাদক-সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কমান্ডের মতে, অপারেশনটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা রক্ষার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়েছে।
অভিযোটের সময় নৌযানটি পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের আন্তর্জাতিক জলে অবস্থান করছিল। সাউথকমের তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্যবস্তু নৌযানটি মাদক পাচার বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে কোনো সরাসরি প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। তবে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই যুক্তি দিয়ে অপারেশনকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।
আলজাজিরা প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাউথকমের দাবির বিপরীতে, সংশ্লিষ্ট নৌযান বা নিহত ব্যক্তিদের মাদক পাচারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার কোনো স্পষ্ট প্রমাণ এখনো উপস্থাপিত হয়নি। এই তথ্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা যুক্তরাষ্ট্রের অপারেশনকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও স্বাধীন পর্যবেক্ষকগণ বলছেন, প্রশান্ত ও ক্যারিবীয় সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌযান থেকে চালিত এই ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তারা জোর দিয়ে বলছেন যে, কোনো স্বচ্ছ প্রমাণ ছাড়া লক্ষ্যবস্তু নৌযানের ওপর সরাসরি আক্রমণ করা আন্তর্জাতিক মানবিক নীতির বিরোধী।
সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৪টি অনুরূপ অপারেশন চালানো হয়েছে বলে রেকর্ড রয়েছে। এই সব অভিযানে মোট ১২৬ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এই সংখ্যা মানবাধিকার সংস্থার সংকলিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত হয়েছে এবং এটি অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিবেশে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
ওয়াচডগ সংস্থা এয়ারওয়ার্সের তথ্য অনুসারে, ২০২৬ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অধীনে প্রথমবার নৌযানকে লক্ষ্য করে সরাসরি হামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। যদিও ট্রাম্পের মেয়াদ ২০২১ সালে শেষ হয়েছে, তথাপি এই রেকর্ডটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নীতি ও অপারেশনাল পদ্ধতির ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে।
একজন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞের মতে, কোনো স্বীকৃত আন্তর্জাতিক চুক্তি বা অনুমোদন ছাড়া নৌযানের ওপর সরাসরি শারীরিক আক্রমণ করা জাতিসংঘের সীমানা রক্ষা সংক্রান্ত নীতি লঙ্ঘন করে। তিনি উল্লেখ করেন যে, এমন অপারেশনকে বৈধতা দিতে হলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্পষ্ট অনুমোদন প্রয়োজন।
লাতিন আমেরিকান দেশগুলো, বিশেষ করে ক্যারিবীয় অঞ্চলের সরকারগুলো এই ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপকে উদ্বেগের সঙ্গে গ্রহণ করেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা দাবি করছে, পাশাপাশি মাদক পাচার মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘটনাকে ‘অবৈধ মাদক ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, ভবিষ্যতে সমজাতীয় হুমকি সনাক্ত হলে একই ধরনের অপারেশন চালিয়ে যাবে, তবে আন্তর্জাতিক আইনের সীমার মধ্যে কাজ করবে।
প্রশান্ত মহাসাগরে নৌযানের ওপর এই ধরনের আক্রমণ অঞ্চলীয় নিরাপত্তা কাঠামোর উপর প্রভাব ফেলতে পারে। সামুদ্রিক বাণিজ্য পথের নিরাপত্তা, মাছ ধরা শিল্প এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের জীবিকা এই ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপের ফলে অস্থিরতা অনুভব করতে পারে।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে এই অপারেশনকে নিয়ে আলোচনা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক আইনের বিশেষজ্ঞরা যুক্তরাষ্ট্রকে স্বচ্ছতা প্রদান এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করার আহ্বান জানাচ্ছেন।



