গতকাল (শুক্রবার) ডেইলি সানের উদ্যোগে ঢাকা শহরের ডেইলি সান কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে ‘গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড, লোকাল রুটস’ শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা, তার সীমাবদ্ধতা, আর্থিক সহায়তা এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করা হয়। উপস্থিত ছিলেন দেশের শীর্ষ ২০টি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলের প্রধান ও সহ-প্রধান, শিক্ষা পরামর্শক, ব্যাংক ও কর্পোরেট সংস্থার প্রতিনিধিরা, পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা।
ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সময় দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সমস্যার সম্মুখীন হয়। অনেক শিক্ষার্থী স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষণ পদ্ধতি ও ভাষা ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করে বিদেশে উচ্চশিক্ষা অনুসরণ করে। ফলে প্রতি বছর প্রায় দশ হাজার শিক্ষার্থী বিদেশে অনার্স, মাস্টার্স বা পিএইচডি করার জন্য যান। যদিও কিছু শিক্ষার্থী বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে আসে, তবে এই প্রবণতা মেধা পাচার হিসেবে নয়, দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখার সম্ভাবনা (ব্রেইন গেইন) হিসেবে দেখা উচিত।
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ড. মো. আবুল কাশেম মিয়া উল্লেখ করেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের খাপ খাওয়ানো এখনও কঠিন। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের পাঠ্যক্রম ও শিক্ষার পরিবেশকে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য আরও বন্ধুত্বপূর্ণ করতে কাজ করছে। এই পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের দেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ বাড়াবে এবং বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন কমাবে।
ব্রিটিশ কাউন্সিলের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট অফিসার তাহনি ইয়াসমিন জানান, বর্তমানে দেশে দুইশতাধিক ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল রয়েছে। এই স্কুলগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষা প্রদান করার চেষ্টা করলেও, স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতনতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করতে পারে না, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় পরিচয়ের ক্ষয় ঘটাতে পারে।
বৈঠকে অংশগ্রহণকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান ও সহ-প্রধানরা একমত যে, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সরকারী নীতিগত সহায়তা এবং সরকারি‑বেসরকারি অংশীদারিত্ব অপরিহার্য। তারা উল্লেখ করেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সহায়তা, বৃত্তি ও গবেষণা তহবিলের সম্প্রসারণ, পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থার প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ সহায়তা শিক্ষার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বৈঠকের উদ্বোধনী শুভেচ্ছা বক্তব্যে ডেইলি সানের সম্পাদক রেজাউল করিম লোটাস শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে সমন্বিত প্রচেষ্টার আহ্বান জানান। সঞ্চালনা করেন ডেইলি সানের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর তাসভীর উল ইসলাম, যিনি অংশগ্রহণকারীদের মতামত সংগ্রহের গুরুত্ব তুলে ধরেন। আলোচনার সময় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, পাঠ্যপুস্তকের আধুনিকীকরণ এবং আন্তর্জাতিক মানের মূল্যায়ন পদ্ধতি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়।
বৈঠকের মূল সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে রয়েছে: ১) পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সমন্বয়মূলক কোর্স চালু করা, ২) বেসরকারি স্কুলগুলোকে স্থানীয় সংস্কৃতি সংযোজনের জন্য প্রণোদনা প্রদান, ৩) সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে যৌথ গবেষণা প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষার গুণগত মান বাড়ানো, এবং ৪) শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর দেশে ফিরে আসার জন্য আকর্ষণীয় কর্মসংস্থান সুযোগ তৈরি করা।
এই ধরনের সমন্বিত নীতি বাস্তবায়ন করলে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিতে পারবে, পাশাপাশি দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাদের সংযুক্তি বাড়বে। শেষমেশ, শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ব্যবহারিক পরামর্শ রাখা যায়: উচ্চশিক্ষা পরিকল্পনা করার সময় বিদেশে যাওয়ার আগে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইংরেজি ভিত্তিক কোর্স ও স্কলারশিপের সুযোগগুলো গবেষণা করে দেখা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে দেশে ফিরে এসে ক্যারিয়ার গড়ার সম্ভাবনা বাড়ে।



