দুবাই ভিত্তিক লজিস্টিক্স জায়ান্ট ডি.পি. ওয়ার্ল্ড চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এর লিজ গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে শ্রমিকদের ধর্মঘট এবং বিভিন্ন প্রতিবাদসূচি চালু হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের এপস্টেইন ফাইলের নথিতে ডি.পি. ওয়ার্ল্ডের নাম উঠে এসেছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোম্পানির শীর্ষস্থানীয় অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এনসিটি লিজের চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সরকারী অনুমোদন প্রক্রিয়া চলমান, তবে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো কর্মসংস্থান নিরাপত্তা এবং শর্তাবলীর স্বচ্ছতা দাবি করে প্রতিবাদে অংশ নিচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরে কাজ করা শ্রমিকদের মধ্যে ধর্মঘটের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় ব্যবসা ও রপ্তানি-আমদানি কার্যক্রমে ব্যাঘাতের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারী শ্রমিকরা সরকারকে লিজ চুক্তির শর্তাবলী প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। এই পরিস্থিতি দেশের বাণিজ্যিক লজিস্টিক্স নেটওয়ার্কে অস্থায়ী অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
টেলিগ্রাফের প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের টেমস নদীর তীরে ১৮০ কোটি পাউন্ড মূল্যের একটি নতুন বন্দর নির্মাণে ডি.পি. ওয়ার্ল্ডকে জেফ্রি এপস্টেইন সহযোগিতা করেছিল। এ প্রকল্পটি যুক্তরাজ্যের বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো বিনিয়োগ হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং এপস্টেইন এই কাজের জন্য ব্রিটিশ বাণিজ্যমন্ত্রী পিটার ম্যান্ডেলসনকে লবিং করেছিল।
মার্কিন বিচার বিভাগ প্রকাশিত নথি অনুসারে, ২০০৯ সালে ডি.পি. ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েমের বিনিয়োগ সংক্রান্ত একটি ইমেইল পিটার ম্যান্ডেলসনের কাছে ফরোয়ার্ড করা হয়। ঐ ইমেইলে এপস্টেইন সুলায়েমের পক্ষ থেকে ম্যান্ডেলসনকে প্রকল্পের আর্থিক দিক এবং সরকারী সমর্থনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছিল।
সেই ইমেইলে উল্লেখ করা হয়েছে, £1.8 বিলিয়ন মূল্যের টেমস বন্দর প্রকল্প যুক্তরাজ্যের সর্ববৃহৎ অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো বিনিয়োগ হবে, যা প্রায় ৩৬,০০০ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং বার্ষিক £৩.২ বিলিয়ন অর্থনৈতিক অবদান রাখবে। প্রকল্পের অনুমোদনের পর ডি.পি. ওয়ার্ল্ড টেমস নদীতে একটি আধুনিক বন্দর নির্মাণ সম্পন্ন করে, যা ইউরোপীয় বাণিজ্যের নতুন হাব হিসেবে কাজ করছে।
জুলাই ২০০৯-এ সুলায়েম এপস্টেইনকে আরেকটি মেইল পাঠায়, যেখানে যুক্তরাজ্যের ব্যাংকগুলো অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অনিশ্চিত হওয়ায় সরকারকে ঋণ গ্যারান্টি বা আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়। একই মেইলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুমের রাষ্ট্রীয় সফরের আগে এই ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
ম্যান্ডেলসন গত রবিবার ব্রিটিশ লেবার পার্টির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন, এপস্টেইনের সঙ্গে তার যোগাযোগ প্রকাশিত হওয়ার পর। তিনি পরে প্রকাশ্যে এপস্টেইনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অনুতপ্ত হয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন। ডি.পি. ওয়ার্ল্ড এবং ম্যান্ডেলসন উভয়ই এই নথি সম্পর্কে মন্তব্যের জন্য অনুরোধের উত্তর দেননি।
ডি.পি. ওয়ার্ল্ডের চট্টগ্রাম টার্মিনাল লিজ প্রক্রিয়ায় এপস্টেইন ফাইলের সংযোগ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের নজরে ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে। লিজের অনুমোদন বিলম্বিত হলে বাংলাদেশে রপ্তানি-আমদানি খাতের লজিস্টিক্স খরচ বৃদ্ধি পেতে পারে, আর কোম্পানির সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভবিষ্যৎ প্রকল্পে বিদেশি মূলধনের প্রবাহ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে, আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলো নতুন টার্মিনালের কার্যকারিতা নিয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে পারে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, ডি.পি. ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যুক্ত এপস্টেইন সম্পর্কের স্বচ্ছতা না থাকলে চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। তবে সরকার যদি লিজ প্রক্রিয়ায় কঠোর শর্ত আর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে, তবে দীর্ঘমেয়াদে বন্দর ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ও বাণিজ্যিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, যা দেশের বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সংক্ষেপে, ডি.পি. ওয়ার্ল্ডের লিজ চুক্তি এবং এপস্টেইন ফাইলের প্রকাশ উভয়ই বাংলাদেশের বন্দর খাতের জন্য সতর্কতা ও সুযোগ উভয়ই নিয়ে এসেছে। স্বচ্ছ নীতি, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক তত্ত্বাবধান এবং শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জকে রূপান্তরিত করা সম্ভব।



