জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভোটের প্রস্তুতি ও উদ্বেগের মিশ্রণ দেখা দিচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটের জন্য দেশের বিভিন্ন কোণায় যুবক-যুবতীরা প্রশ্নের মুখে। তারা পরিবর্তনের আশা পোষণ করে, তবে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছে।
এই নির্বাচনকে শুধু ভোট দেওয়ার কাজ হিসেবে নয়, রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষারূপে দেখা হচ্ছে। প্রার্থীরা তরুণ ভোটারদের উদ্বেগকে মাথায় রেখে তাদের নীতি ও প্রতিশ্রুতি গঠন করার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানের পর ১৩তম সংসদ নির্বাচনের প্রত্যাশা তরুণদের মধ্যে বাড়ে।
আওয়ামী লীগ শাসনামলে পরপর তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে না পারা তরুণদের জন্য এই নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তারা ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত এই নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী, যেখানে সংসদীয় নির্বাচন ও গণভোট একসাথে অনুষ্ঠিত হবে।
জামালপুরে ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রায় দেড় লাখ প্রথমবারের মতো ভোট দেবে এমন তরুণ ভোটারদের সংখ্যা গন্যে উল্লেখযোগ্য। এই বৃহৎ সংখ্যক প্রথমবারের ভোটার দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশে প্রভাব ফেলতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সদস্য এবং স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের চূড়ান্ত বর্ষের শিক্ষার্থী হেমা চাকমা প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের কথা ভাবছেন। তবে তিনি এখনও সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি।
হেমা চাকমা ২০২৪ সালের নির্বাচনে খাগড়াছড়ির পানছড়িতে ভোট বর্জনের কথা স্মরণ করে বলেন, সরকারে অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাসের কারণে তিনি সেই সময়ে অংশ নিতে পারেননি। চারজন ছাত্রনেতার হত্যার মামলার বিচার না হওয়াও তার অবিশ্বাসকে বাড়িয়ে তুলেছে।
বর্তমান নির্বাচনী পরিবেশে হেমা চাকমা কোনো বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করেন না। যদিও ভোট বর্জনের মতো পরিস্থিতি নেই, তবুও নিরাপত্তা নিয়ে তার উদ্বেগ অব্যাহত। তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচনের পরিণতি রক্তপাতের দিকে ঝুঁকতে পারে, তাই তিনি শেষ পর্যন্ত ভোট দেবেন কিনা তা নিশ্চিত নন।
খাগড়াছড়ি পুলিশ অনুযায়ী, পার্বত্য খাগড়াছড়ি-২৯৮ সংসদীয় আসনের ২০৪টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৮৫টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং তার মধ্যে ৬৩টি ‘অধিক ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই তথ্য হেমা চাকমার নিরাপত্তা উদ্বেগকে সমর্থন করে।
নারী ভোটারদের পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কিছু রাজনৈতিক দল জনসমক্ষে নারীদের প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য করে এবং নারী নেতৃত্বের সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ করে। হেমা চাকমা উল্লেখ করেন, এমন পরিবেশে নারীদের অংশগ্রহণ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
হেমা চাকমা বলেন, জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানের পর তিনি যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা এখনো বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। তিনি আশা করেন, এই নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক সংস্কারে নতুন দিক উন্মোচন করবে।
নির্বাচন কমিশন ও নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গৃহীত হবে। তবে তরুণ ভোটারদের মধ্যে এখনও নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে।
এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের হার এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে প্রভাবিত করতে পারে। তরুণ ভোটারদের উদ্বেগ যদি যথাযথভাবে সমাধান না হয়, তবে ভোটের হার কমে যাওয়া এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অবশেষে, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে তরুণ ও নারী ভোটারদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে, নিরাপদ ও ন্যায়সঙ্গত নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে এই ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রগতিতে একটি মাইলফলক হয়ে ওঠে।



