বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আল‑জাজিরার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করে বলেন, দলটির মূল উদ্দেশ্য ধর্মনিরপেক্ষতা অনুসরণ করা নয়, বরং সব ধর্ম ও বিশ্বাসের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা। তিনি উল্লেখ করেন, যদি কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা করা যায়, তবে অন্য কোনো বাধা নেই।
মহাসচিবের মতে, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে মানানসই নয়। তিনি ব্যাখ্যা করেন, দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৯৫ শতাংশ মুসলমান, ফলে ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা বাস্তবায়নে জটিলতা দেখা দেয়। তাই দলটি ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার পাশাপাশি সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে অগ্রাধিকার দেবে।
বিএনপি তার ঐতিহাসিক রেকর্ডকে সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষায় সর্বোত্তম হিসেবে উপস্থাপন করে। আল‑জাজিরার সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, অতীতের রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলোতে দেখা সমস্যাগুলো রাজনৈতিক স্বভাবের, ধর্মীয় নয়। তিনি যুক্তি দেন, ভারতীয় মিডিয়া প্রায়ই এসব ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক হিসেবে চিত্রিত করে, কিন্তু বাস্তবে তা রাজনৈতিক সংঘাতের ফল।
ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি উল্লেখ করেন, যদি কোনো ব্যক্তি আওয়ামী লীগের সমর্থক হন এবং অন্যজনের ওপর হিংসা করা হয়, তবে তা সাম্প্রদায়িক নয়, বরং রাজনৈতিক বৈরিতা। এ ধরনের বিশ্লেষণকে তিনি দলটির সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষার নীতি হিসেবে তুলে ধরেন।
আল‑জাজিরার সাংবাদিক উল্লেখ করেন, মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত চারদলীয় জোটের শাসনকালে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা বেড়েছিল এবং তা দেশের জন্য বিপজ্জনক সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। মির্জা ফখরুলের প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট—তিনি এমন কোনো রেকর্ড কখনো দেখেননি বা পড়েননি।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক জরিপে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা বৃদ্ধি এবং বিএনপি ও জামায়াত-এ-ইসলামি সমর্থকদের প্রতিশোধমূলক হিংসায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠে। এ বিষয়ে মির্জা ফখরুল মন্তব্য করেন, এসব তথ্য পক্ষপাতদুষ্ট এবং বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন। তিনি দলটির নীতি ও কর্মকাণ্ডকে এই অভিযোগের বিপরীতে তুলে ধরেন।
বিএনপি নির্বাচনে জয়লাভের পর তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গৃহীত হলে জুলাই মাসে সম্ভাব্য অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে কিনা, এ প্রশ্নের উত্তরে মির্জা ফখরুল জানান, তারেক রহমান ইতিমধ্যেই তার পরিকল্পনা জনসমক্ষে প্রকাশ করেছেন। তিনি লন্ডন থেকে ফিরে আসার পর প্রথম দিনেই বিমানবন্দর ও রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ জড়ো হওয়ার কথা উল্লেখ করেন।
এই বিবৃতি থেকে স্পষ্ট হয়, দলটি তারেক রহমানের নেতৃত্বে সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য জনমত গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে তিনি কোনো সরাসরি হুমকি বা সহিংসতার ইঙ্গিত দেননি, বরং জনসাধারণের সমর্থন ও অংশগ্রহণের গুরুত্বের ওপর জোর দেন।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, যদি বিএনপি সরকার গঠন করে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হন, তবে সংখ্যালঘু অধিকার সংক্রান্ত নীতি পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। একই সঙ্গে, জামায়াত-এ-ইসলামি ও অন্যান্য জোটের সঙ্গে সম্পর্কের ওপরও দৃষ্টিপাত হবে, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার সমালোচনা কীভাবে মোকাবেলা করা হবে তা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সামগ্রিকভাবে, মির্জা ফখরুলের বক্তব্য থেকে দেখা যায়, বিএনপি ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমান অধিকারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং অতীতের রাজনৈতিক সংঘাতকে ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করছে। এই অবস্থান ভবিষ্যৎ নির্বাচনী কৌশল ও সরকার গঠনের সময় পার্টির নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে।



