ব্রিটিশ-আমেরিকান গবেষকরা ৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে জানিয়েছেন যে, বানর প্রজাতির বোনোবো কানজি একটি কল্পিত চা পার্টিতে অদৃশ্য রস ও কল্পিত আঙুরের উপস্থিতি নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছে। পরীক্ষায় কানজি ৬৮ শতাংশ সঠিক উত্তর দিয়েছে, যা স্বাভাবিক অনুমানের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
মানব শিশুরা এক বছর বয়সেই কল্পনা ভিত্তিক খেলায় লিপ্ত হতে শুরু করে এবং তিন বছর বয়সে সম্পূর্ণ কল্পনাপ্রবণ জগত গড়ে তোলার দক্ষতা অর্জন করে। এই ক্ষমতা মানব মস্তিষ্কের উচ্চতর চিন্তাধারার ভিত্তি, এবং এখন পর্যন্ত এটি কেবল মানুষেরই বৈশিষ্ট্য বলে ধরা হতো। তবে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো দেখাচ্ছে যে, শিম্পাঞ্জি ও গোরিলা ছাড়াও বোনোবোরাও একই রকম কল্পনা ক্ষমতা রাখে।
কানজি হল এক বিশেষ বোনোবো, যাকে লেক্সিগ্রাম নামের চিত্রচিহ্ন ব্যবহার করে শব্দের সঙ্গে যুক্ত করে যোগাযোগ করতে শেখানো হয়েছে। স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক মনোবিজ্ঞানী আমালিয়া বাস্টোস ২০২৩ সালে প্রথমে তাকে দেখার সুযোগ পান। লেক্সিগ্রাম বোর্ডের মাধ্যমে কানজি প্রথমবারের মতো মানবদেরকে একে অপরকে তাড়া করতে বলেছিল, যদিও তা শুধুই নকল খেলা ছিল। এই পর্যবেক্ষণই গবেষকদের কল্পনা পরীক্ষা করার নতুন ধারনা তৈরি করতে সহায়তা করে।
বাস্টোস এবং জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ক্রিস্টোফার ক্রুপেনিয়ে একসাথে এমন এক সিরিজ পরীক্ষার পরিকল্পনা করেন, যেখানে বানরকে কল্পিত পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়। প্রথম পরীক্ষায় কানজিকে একটি টেবিলে দুইটি গ্লাসে বসানো হয়। পরীক্ষক একটি স্বচ্ছ, তবে খালি জগ থেকে “রস” ঢেলে গ্লাস দুটিতে ঢালেন, যদিও প্রকৃতপক্ষে কোনো তরল না থাকে। এরপর এক গ্লাসের “রস” আবার জগে ঢেলে দেন এবং কানজিকে জিজ্ঞাসা করেন কোন গ্লাসে এখনও রস আছে।
কানজি ১০টি পুনরাবৃত্তির মধ্যে ৬-৭ বার সঠিক উত্তর দিয়েছে, যা মোট ৬৮ শতাংশের সমান। এই ফলাফল পরিসংখ্যানগতভাবে কাকতালীয় অনুমানের চেয়ে অনেক বেশি, ফলে গবেষকরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে বানরটি অদৃশ্য বস্তু সম্পর্কে ধারণা গঠন করতে পারে।
এই ধরনের কল্পনা ক্ষমতা নির্দেশ করে যে, বোনোবোর মস্তিষ্কে এমন একটি মানসিক মডেল গড়ে ওঠে, যা বর্তমানের বাইরে কোনো ঘটনার সম্ভাবনা অনুমান করতে সক্ষম। ফলে “এখানে-এখন” সীমা অতিক্রম করে ভবিষ্যৎ বা অতীতের পরিস্থিতি কল্পনা করা সম্ভব হয়। এই বৈশিষ্ট্য মানবজাতির বৌদ্ধিক বিকাশের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যদিও তার জটিলতা ও পরিসরে পার্থক্য থাকতে পারে।
কানজির এই পারফরম্যান্স বোনোবোর যোগাযোগ ও সামাজিক আচরণে নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করে। লেক্সিগ্রাম ব্যবহার করে শব্দের সঙ্গে চিত্র সংযোগের মাধ্যমে তারা তথ্য আদানপ্রদান করতে পারে, আর এখন দেখা যাচ্ছে যে তারা কল্পিত তথ্যও প্রক্রিয়া করতে পারে। এই ফলাফল ভবিষ্যতে বানরদের সঙ্গে আরও সূক্ষ্ম যোগাযোগের সম্ভাবনা উন্মোচন করতে পারে, যেমন কল্পিত পরিস্থিতিতে নির্দেশনা দেওয়া বা যৌথ কল্পনা গড়ে তোলা।
গবেষণাটি প্রমাণ করে যে, কল্পনা ক্ষমতা কেবল মানবজাতির একচেটিয়া নয়, বরং কিছু প্রাইমেটের মস্তিষ্কেও বিদ্যমান। এই বিষয়টি আমাদের প্রজাতি ও অন্যান্য প্রাণীর বৌদ্ধিক পার্থক্য পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করে। আপনি কি মনে করেন, ভবিষ্যতে এমন গবেষণা আমাদের প্রাণী সংরক্ষণ ও নৈতিক নীতিতে কী প্রভাব ফেলবে?



