ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটে (ডিআরইউ) বৃহস্পতিবার ‘প্রায়োরিটি হেলথ রিফর্ম অ্যাকশন এজেন্ডা: বাংলাদেশ রোড টু ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ’ শীর্ষক নীতিনির্ধারণী সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। পিপিআরসি ও ইউএইচসি ফোরাম যৌথভাবে আয়োজন করা এই সভায় রাজনৈতিক দল, একাডেমিক প্রতিষ্ঠান, সরকার, সুশীল সমাজ, উন্নয়ন সহযোগী ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। সংলাপের মূল উদ্দেশ্য ছিল ২০২৪ সালের নির্বাচনী পরিবর্তনের পর উদ্ভূত নীতিগত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে স্বাস্থ্যখাতের সংস্কারকে বাস্তবিক কর্মপদ্ধতিতে রূপান্তর করা।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান উল্লেখ করেন, দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সংস্কারে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বিকল্প নেই। তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর যারা শাসনভার গ্রহণ করবেন, তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হচ্ছে যে তারা স্বাস্থ্যখাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি নেবেন।
ড. হোসেনের মন্তব্যের পর, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (ড্যাব) মহাসচিব ডা. জাহিরুল ইসলাম শাকিল স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘদিনের বাস্তবায়ন ঘাটতি ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, যদিও সরকার বারবার স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দরজায় পৌঁছাবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তবুও এখনও অনেক মানুষ উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত। স্পষ্ট সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশন কার্যকর করা হয়নি।
বিএনপির পরিবার কল্যাণবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মহসিন জিল্লুর করিম ভুল রোগ নির্ণয় ও রোগী শোষণের ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ভুল চিকিৎসা এখন দেশের স্বাস্থ্যসেবার একটি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং সমস্যার মূলস্থলে হস্তক্ষেপ করা জরুরি। রোগীর অধিকার রক্ষার জন্য এমন চিকিৎসক তৈরি করা প্রয়োজন যারা নৈতিক মানদণ্ড মেনে চলবে।
ডা. মহসিনের বিশ্লেষণে চিকিৎসা প্রশিক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলা হয়েছে, যাতে জনস্বাস্থ্যের প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধার করা যায়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার দুর্বলতা রোগীর শোষণকে বাড়িয়ে তুলছে এবং তা রোধে কঠোর তদারকি প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. সৈয়দ উমর খৈয়াম শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক অর্থনীতির স্বাস্থ্যখাতের সংস্কারে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে স্বাস্থ্য নীতির সমন্বয় না হলে সংস্কার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে।
হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজও একই আলোচনায় অংশ নেন এবং স্বাস্থ্যখাতে দলীয় রাজনীতির প্রভাব সম্পর্কে মত প্রকাশ করেন। তিনি জোর দেন, রাজনৈতিক দলগুলোর স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদী সংস্কার সম্ভব নয়।
সংলাপের সময় উপস্থিত বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা একমত হন যে, স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য সমন্বিত নীতি, পর্যাপ্ত বাজেট এবং কার্যকর বাস্তবায়ন মেকানিজম অপরিহার্য। তারা সুপারিশ করেন, সরকারকে স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা তৈরি করে তা ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, বর্তমান স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোতে মানবসম্পদ, সরঞ্জাম ও ঔষধের ঘাটতি রয়েছে, যা রোগীর সেবা মানকে প্রভাবিত করছে। এ জন্য প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়ানো, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং ঔষধের সাশ্রয়ী মূল্যে প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি।
উল্লেখযোগ্য যে, স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশনের গঠন ও কার্যক্রম এখনও স্থগিত রয়েছে, যদিও পূর্বে স্পষ্ট সুপারিশ করা হয়েছিল। এই দেরি সংস্কার পরিকল্পনার বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে এবং জনসাধারণের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সংলাপের সমাপ্তিতে অংশগ্রহণকারীরা একমত হন যে, আসন্ন নির্বাচনের পর রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ব্যবহার করে স্বাস্থ্যখাতে কাঠামোগত সংস্কার দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। তারা সরকারকে আহ্বান জানান, স্বাস্থ্যসেবার সমতা, গুণগত মান এবং সবার জন্য সাশ্রয়ীতা নিশ্চিত করতে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে।
এই আলোচনার পর, স্বাস্থ্যখাতের ভবিষ্যৎ গঠনে রাজনৈতিক অঙ্গীকার, নীতি নির্ধারণে স্বচ্ছতা এবং বাস্তবায়নে কার্যকর তদারকি একসাথে কাজ করবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।



