নাইজেরিয়ার মধ্যাঞ্চলীয় কোয়ারা রাজ্যের কায়ামা জেলার ওরু গ্রামে মঙ্গলবার সন্দেহভাজন জিহাদি গোষ্ঠীর আক্রমণে ১৭০ জনের বেশি প্রাণ হারিয়ে গেছেন, আর বহু মানুষ আহত হয়েছেন। এই হামলা চলতি বছরের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘটনার মধ্যে গণ্য এবং নিকটবর্তী সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি তীব্রতর করেছে। সরকার তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে জরুরি সেবা পাঠিয়ে মৃতদেহ সংগ্রহ ও আহতদের চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু করেছে।
প্রেসিডেন্ট বোলা তিনুবু এই ঘটনার পর গ্রামটিতে এক ব্যাটালিয়ন সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানোর ঘোষণা দেন। তিনি জানিয়েছেন, নতুন ইউনিটের উপস্থিতি পুনরাবৃত্তি হামলা রোধে সহায়ক হবে এবং দূরবর্তী সম্প্রদায়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। মোতায়েন করা ব্যাটালিয়নটি মূলত প্যাথফাইন্ডার ও হেভি আর্টিলারিতে সজ্জিত, যা দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণে সক্ষম।
কয়েক মাস আগে থেকে ইসলামিক স্টেট ওয়েস্ট আফ্রিকা প্রভিন্স (ISWAP) এবং অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠী কোয়ারা রাজ্যের বিভিন্ন গ্রামে আক্রমণ ও অপহরণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে শিবির ও কাইনজি বনাঞ্চলের নিকটবর্তী এলাকায় তাদের উপস্থিতি বাড়ার লক্ষণ দেখা গেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, এই গোষ্ঠীগুলো উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে কাইনজি বনকে নতুন আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, কাইনজি বনাঞ্চল ভূগোলগতভাবে কঠিন ও ঘনবনভূমি হওয়ায় জিহাদিদের জন্য কৌশলগত সুবিধা প্রদান করতে পারে। তারা এই অঞ্চলকে দীর্ঘমেয়াদী অস্ত্রোপচার ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে, যা ভবিষ্যতে বৃহত্তর আক্রমণের ভিত্তি হতে পারে। তাই নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য এই বনকে নিয়ন্ত্রণে রাখা অগ্রাধিকারপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রেসিডেন্ট তিনুবু জিহাদি আক্রমণকে “কাপুরুষোচিত ও বর্বর” বলে নিন্দা করে এবং গ্রামবাসীর প্রতিরোধের প্রশংসা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, শত্রুরা এমন গ্রামগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানায় যারা ধর্মীয় চাপে সরে না। তাছাড়া, তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যরাও শান্তি ও মানবিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেয়, তাই তারা জিহাদিদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
স্থানীয়দের মতে, আক্রমণকারী দীর্ঘ সময় ধরে গ্রামটিতে ধর্মীয় প্রচার চালিয়ে শারিয়া আইন গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে আসছিল। গ্রামবাসী যখন এই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে, তখন জিহাদিরা হঠাৎ গুলি চালিয়ে বড় ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে। কিছু গ্রামবাসী জানান, হামলার সময় গুলি শোনার সঙ্গে সঙ্গে তারা নিরাপত্তা বাহিনীর সাহায্য চেয়েছিল, তবে তৎক্ষণাৎ কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
হামলায় অন্তত ৩৮টি বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে গেছে এবং বহু পরিবার তাদের বাসস্থান হারিয়ে ফেলেছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য সাইদু বাবা আহমেদ উল্লেখ করেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে তাত্ক্ষণিক সহায়তা ও পুনর্বাসন প্রয়োজন। এছাড়া, বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটায় গ্রামটির মৌলিক জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নাইজেরিয়ার নিরাপত্তা নীতির ওপর সমালোচনা বাড়ছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাইজেরিয়ার সরকারকে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন। ২৫ ডিসেম্বর মার্কিন সামরিক বাহিনী নাইজেরিয়ার জঙ্গি শিবিরে আক্রমণ চালায়, তবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দাবি করে যে, এই পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় সীমিত ছিল।
প্রেসিডেন্ট তিনুবু উল্লেখ করেন, ভবিষ্যতে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়িয়ে জিহাদিদের চলাচল সীমাবদ্ধ করা হবে এবং গ্রামবাসীর সঙ্গে সমন্বয় করে পুনরুদ্ধার কাজ ত্বরান্বিত করা হবে। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহায়তা ও তথ্য শেয়ারিং নিরাপত্তা শক্তিশালী করার মূল চাবিকাঠি। সরকার ইতিমধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর পরিকল্পনা চালু করেছে।
বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, যদি জিহাদি গোষ্ঠীর আক্রমণ থামানো না যায়, তবে কোয়ারা রাজ্যের অন্যান্য গ্রামেও একই রকম হিংসাত্মক ঘটনা ঘটতে পারে। তাই নিরাপত্তা বাহিনীর দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও সম্প্রদায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার কঠিন হবে।
এই ঘটনার পর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া ব্যাপকভাবে কভারেজ দিয়েছে, যা নিরাপত্তা নীতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। সরকার এখন পর্যন্ত যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছে, সেগুলোকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা এবং গ্রামবাসীর মৌলিক চাহিদা মেটানোই পরবর্তী চ্যালেঞ্জ। শেষ পর্যন্ত, নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত কোয়ারা রাজ্যের গ্রামগুলোতে অতিরিক্ত সশস্ত্র উপস্থিতি বজায় থাকবে।



