উপদেষ্টা পরিষদ ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে নতুন “ডাকসেবা অধ্যাদেশ, ২০২৬”‑এর চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়, যা বাংলাদেশ সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ১২৭ বছর পুরোনো “দ্য পোস্ট অফিস অ্যাক্ট, ১৮৯৮”‑কে সম্পূর্ণভাবে বদলে আধুনিক ও ডিজিটাল ভিত্তিক একটি কাঠামো গড়ে তোলা হবে। নতুন আইনটি দেশের ই‑কমার্স বৃদ্ধি, আধুনিক ঠিকানা ব্যবস্থাপনা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছে।
ব্রিটিশ শাসনামলে গৃহীত ১৮৯৮ সালের পোস্ট অফিস আইন দীর্ঘ সময়ের পর প্রথমবারের মতো পরিবর্তনের মুখে দাঁড়িয়েছে। পূর্বের আইনটি আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তি ও ডিজিটাল লেনদেনের চাহিদা মেটাতে অক্ষম বলে সমালোচিত হচ্ছিল। তাই বাংলাদেশ সরকার ডিজিটাল রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করতে এবং আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্য রাখতে এই নতুন অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেছে।
অধ্যাদেশের মূল লক্ষ্য হল ডাক সেবাকে ই‑কমার্সের সঙ্গে সংযুক্ত করা, ঠিকানা ব্যবস্থাকে জিপিএস‑ভিত্তিক সিস্টেমে রূপান্তর করা এবং ব্যবহারকারীর তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করা। এ জন্য “ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫”‑এর নীতিগুলোকে সমন্বিত করে ডেটা সুরক্ষার কঠোর ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে। একই সঙ্গে ডাক বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি আপগ্রেডের পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন অধ্যাদেশে “মেইলিং কুরিয়ার লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ” প্রতিষ্ঠার বিধান রয়েছে, যা সকল বাণিজ্যিক ডাক ও কুরিয়ার অপারেটরের লাইসেন্স প্রদান এবং সেবার মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকবে। এই সংস্থা লাইসেন্সের শর্তাবলী নির্ধারণ, পর্যবেক্ষণ এবং লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে শাস্তি আরোপের ক্ষমতা পাবে।
লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও স্বার্থের সংঘাত রোধে “পোস্টাল কাউন্সিল” গঠন করা হয়েছে। এই কাউন্সিলের সদস্যরা সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রের প্রতিনিধিত্বকারী হবে, যাতে নীতি নির্ধারণে বহুমুখী দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করা যায়।
অধিকারে, বৈধ লাইসেন্স ছাড়া ডাক বা কুরিয়ার ব্যবসা পরিচালনার জন্য আরোপিত জরিমানা এখন সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে, যা পূর্বের ২ লাখ টাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। এই পদক্ষেপটি অনিয়মিত কার্যক্রম দমন এবং সেবা মান উন্নয়নে সহায়তা করবে।
অধ্যাদেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা হল সরকারি তহবিলের ব্যবহার সম্পর্কিত স্বচ্ছতা। বাংলাদেশ সরকারকে এখন ডাক সেবার জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থকে অন্য কোনো প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখতে পৃথক হিসাব রাখতে হবে। এতে তহবিলের অপব্যবহার রোধে আর্থিক নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী হবে।
ডাক বিভাগকে “ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়ন (ইউপিইউ)”‑এর ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত “ডেজিগনেটেড অপারেটর” হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের সেবা প্রদান এবং বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ সহজ হবে।
প্রচলিত ডাকটিকিটের পাশাপাশি এখন থেকে “ই-স্ট্যাম্পিং” বা ডিজিটাল ডাকটিকিট চালু করা হবে। গ্রাহক অনলাইনে পেমেন্ট করে বারকোড বা কিউআর কোড পেতে পারবে, যা শারীরিক টিকিটের সমতুল্য হিসেবে স্বীকৃত হবে। এই ব্যবস্থা লেনদেনের গতি বাড়াবে এবং কাগজের ব্যবহার কমাবে।
ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে “ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫”‑এর বিধানগুলো নতুন ডাকসেবায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গ্রাহকের নাম, ঠিকানা ও যোগাযোগের তথ্যকে এনক্রিপ্টেড ফরম্যাটে সংরক্ষণ এবং শুধুমাত্র অনুমোদিত কর্মীরাই তা অ্যাক্সেস করতে পারবে।
ডাক সেবার অপব্যবহার রোধে প্রেরক ও প্রাপকের এনআইডি বা পাসপোর্ট যাচাইয়ের মাধ্যমে “কেওয়াইসি” প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই ব্যবস্থা মিথ্যা তথ্য দিয়ে ডাক পাঠানো বা গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঝুঁকি কমাবে।
অধ্যাদেশে ডাকসেবাকে “জরুরি সেবা” হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যার ফলে জাতীয় সংকটের সময়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে এবং দ্রুত সাড়া দেওয়া সম্ভব হবে। এছাড়া ডাক নেটওয়ার্ককে “ন্যাশনাল ইনফ্রা-নেটওয়ার্ক” হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে দেশের সব অঞ্চলকে একত্রে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শেষে, নতুন সিস্টেমে এরিয়া কোড, স্ট্রিট কোড এবং হাউজ কোডের ভিত্তিতে ডিজিটাল ঠিকানা ব্যবস্থার উন্নয়ন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই কোডিং পদ্ধতি ঠিকানার সঠিকতা বাড়াবে এবং ডেলিভারির গতি ত্বরান্বিত করবে। নতুন অধ্যাদেশের কার্যকরী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ ডাকের আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যের পথে গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।



