বাংলা একাডেমী ২০ ফেব্রুয়ারি রোজা মাসে বইমেলা চালু করার পরিকল্পনা প্রকাশকদের কাছ থেকে আর্থিক উদ্বেগের মুখে ফেলেছে; তারা ঈদ পরের সময়সূচি অবশ্যই দাবি করছে। প্রকাশক গোষ্ঠী এটিকে একতরফা সিদ্ধান্ত বলে সমালোচনা করছে এবং মেলাটিকে ‘প্রাণহীন’ বলে উল্লেখ করেছে। তারা জানিয়েছে রোজা দিনে দর্শক ও ক্রেতা কমে যাবে, ফলে মেলার কার্যকারিতা হ্রাস পাবে।
প্রকাশক সমিতি বৃহস্পতিবার একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে রোজা মাসে মেলা চালু করার মানবিক ও বাণিজ্যিক প্রভাব তুলে ধরেছে। স্টল কর্মী অধিকাংশই ছাত্র, যারা রোজা রেখে ইফতার ও ত্রাবিহের পরে কাজ করতে বাধ্য হবে, যা মানবিক অধিকার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত। তারা উল্লেখ করেছে, রোজা সময়ে দীর্ঘ সময় কাজ করা শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “প্রাকৃতিক দুর্যোগের অজুহাতে মানবিক ও বাণিজ্যিক বিপর্যয় মেনে নেবে না প্রকাশক সমাজ” এবং বাংলা একাডেমীকে এই পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিতে বলা হয়েছে। স্টল কর্মীদের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি ও কাজের পরিবেশের অস্বস্তি তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া, মানবিক দায়িত্ব লঙ্ঘনের সম্ভাব্য আইনি পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে।
একই সময়ে বাংলা একাডেমী একটি সংবাদ সম্মেলনে জানায় মেলাটির প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং ২০ ফেব্রুয়ারি শুরু করার পরিকল্পনা নিশ্চিত করেছে। তারা মেলাটির প্রস্তুতি, প্যাভিলিয়ন ও স্টল স্থাপন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ইত্যাদি উল্লেখ করেছে। এছাড়া, প্রচারমূলক কার্যক্রম ও মিডিয়া কভারেজের প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়েছে।
প্রকাশক গোষ্ঠী উল্লেখ করে, গত দেড় বছরে কাগজ ও উপকরণের দাম বাড়া এবং বিক্রির মন্দা প্রকাশনা শিল্পকে কঠিন অবস্থায় ফেলেছে। এই আর্থিক চাপের মধ্যে জোর করে মেলা চালিয়ে যাওয়া প্রকাশকদের জন্য বড় ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে ছোট প্রকাশকরা বিক্রয় হ্রাসের ফলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
প্রকাশকরা জানায়, ৩২টি প্যাভিলিয়ন এবং ১৫২টি স্টল রোজা মাসে মেলা না করার এবং ঈদ পর মেলা আয়োজনের পক্ষে স্বাক্ষর করেছে। তারা এই স্বাক্ষরগুলো বাদ দিয়ে মেলা চালিয়ে গেলে তা ইতিহাসের অন্যতম ব্যর্থ ও কলঙ্কিত আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হবে। এছাড়া, স্বাক্ষরিত প্রকাশকদের অংশ বাদ দিলে মেলাটির সমগ্র কাঠামোতে বিশাল ফাঁক সৃষ্টি হবে।
প্রকাশক সমিতি মেলাটির পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে, “ঈদুল ফিতরের পর উৎসবমুখর পরিবেশে মেলা আয়োজনের ব্যবস্থা করুন” বলে দাবি করেছে। অন্যথায় উদ্ভূত কোনো সমস্যার দায়ভার সম্পূর্ণভাবে আয়োজক বাংলা একাডেমীর উপর থাকবে। আয়োজক পক্ষ থেকে এখনও কোনো পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না থাকলেও, প্রকাশক গোষ্ঠীর চিঠি ও স্বাক্ষরিত পত্রগুলো মেলাটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার নতুন দিক উন্মোচন করেছে।
প্রকাশক গোষ্ঠীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নামগুলো হল আহমদ পাবলিশিংয়ের মেছবাহউদ্দীন আহমদ, কাকলী প্রকাশনীর এ কে নাসির আহমেদ, অন্যপ্রকাশের মাজহারুল ইসলাম, অ্যাডর্নের সৈয়দ জাকির হোসাইন, ইতি প্রকাশনীর মো. জহির দীপ্তি, ইউপিএলের মাহরুখ, প্রথমা প্রকাশনের মো. মোবারক হোসেন, লাবনী প্রকাশনীর ইকবাল হোসেন সানু, শোভা প্রকাশের মিজানুর রহমান এবং শব্দশৈলীর ইফতেখার আমিন।
এই প্রকাশকরা একত্রে জোর দিয়ে বলেছেন, রোজা মাসে মেলা চালু করা কেবল বিক্রয় হ্রাসই নয়, স্টল কর্মীদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত দায়িত্বের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করবে। তারা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে মেলাটির সময়সূচি পরিবর্তনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে। এছাড়া, ছাত্র স্বেচ্ছাসেবকদের কাজের সময়সূচি রোজা অনুসারে সামঞ্জস্য করা কঠিন বলে তারা উল্লেখ করেছে।
বাংলা একাডেমী পক্ষ থেকে এখনও কোনো পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না থাকলেও, প্রকাশক গোষ্ঠীর চিঠি ও স্বাক্ষরিত পত্রগুলো মেলাটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার নতুন দিক উন্মোচন করেছে। মেলাটির আয়োজক ও প্রকাশকদের মধ্যে সমঝোতা না হলে উভয় পক্ষই আর্থিক ও সুনামগত ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। সম্ভাব্য মধ্যস্থতা বা তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা উভয় দিকেই স্বীকার করা হচ্ছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে বইমেলা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম, যেখানে নতুন প্রকাশনা, শিক্ষামূলক উপকরণ এবং পাঠকদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ গড়ে ওঠে। রোজা মাসে মেলা চালু হলে শিক্ষার্থী ও পিতামাতার অংশগ্রহণ কমে যাওয়া সম্ভব, যা শিক্ষার প্রচারকে প্রভাবিত করবে। পূর্বের মেলাগুলোতে রোজা সময়ে কম ভিজিটর সংখ্যা দেখা গিয়েছিল, যা এই উদ্বেগকে সমর্থন করে।
শেষমেশ, পাঠকদের জন্য একটি প্রশ্ন রেখে যায়—আপনার মতে, রোজা মাসে বইমেলা চালু করা কি শিক্ষামূলক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তিযুক্ত, নাকি ঈদ পরের উৎসবমুখর সময়ে মেলা আয়োজনই অধিক উপযুক্ত? আপনার মতামত শেয়ার করুন।



