অন্তর্বর্তী সরকার ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিদায় নিতে চলেছে। শীর্ষকালে, গুমের শিকার পরিবারগুলো ধানমন্ডি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স (বিলিয়া) মিলনায়তনে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার আয়োজন করা বৈঠকে সরকারের গুম সংক্রান্ত পদক্ষেপ সম্পর্কে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে।
বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারের দুইজন উপদেষ্টা উপস্থিত ছিলেন; আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ফোনের মাধ্যমে যুক্ত হন, আর শিল্প, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান শারীরিকভাবে অংশ নেন। উভয়েই গুমের মামলায় সরকার যে আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলেছে, তা তুলে ধরে জানান যে গুমের বিচার শুরু হয়েছে এবং ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি ভিত্তিক নতুন বিধান প্রণয়ন করা হয়েছে।
এই বিধানগুলোর মধ্যে গুমের শিকারদের জন্য ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং পরিবারকে আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করার ধারা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ফোনে বলেছিলেন, সরকার গুমের মামলায় দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত বিচার নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।
বৈঠকে উপস্থিত গুমের শিকারদের পরিবারগুলো প্রশ্নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। বাগেরহাটে ২০১১ সালে গুমের শিকার হাবিবের মেয়ে জেসমিন, যিনি নিজের বাবার নিখোঁজ হওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে আসছেন, উপদেষ্টার সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। তিনি সরকারের গুমের শিকারদের জন্য ঘোষিত প্রতিশ্রুতি এবং ভবিষ্যৎ সহায়তা পরিকল্পনা সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চান।
আদিলুর রহমান খান উপস্থিত থাকায় জেসমিনের প্রশ্নের উত্তরে উপদেষ্টা জানান, গুমের শিকারদের জন্য আর্থিক সহায়তা এবং পুনর্বাসন ব্যবস্থা নির্বাচনের পর আরও শক্তিশালী করা হবে এবং সরকার তাদের সঙ্গে সবসময় সংযুক্ত থাকবে। একই সময়ে, ২০১৯ সালে গুমের শিকার হওয়া বিএনপি নেতা ইসমাইল হোসেন বাতেনের স্ত্রী নাসরীন জাহান স্মৃতি, ভিসা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও অপরাধীরা বিদেশে পালিয়ে যাওয়া এবং গুমে জড়িত কর্মকর্তারা এখনও পদোন্নতি পাচ্ছেন এই বিষয়গুলো তুলে ধরে প্রশ্ন করেন।
নাসরীন জাহানের প্রশ্নের উত্তরে আসিফ নজরুল উল্লেখ করেন, অন্য মন্ত্রণালয়ের বিষয়গুলোতে তিনি সরাসরি মন্তব্য করতে পারবেন না, তবে গুমের মামলায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি স্বীকার করেন যে ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগের ভিত্তি যথেষ্ট এবং গুমের শিকারদের জন্য চলমান সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।
বৈঠকের শেষে, উপদেষ্টারা গুমের শিকার পরিবারগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখার এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত সহায়তা প্রদান করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। তারা উল্লেখ করেন, গুমের মামলায় প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষী সুরক্ষা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা আগামী কয়েক মাসের মধ্যে কার্যকর হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের আগে গুমের শিকার পরিবারগুলো এই বৈঠকে সরকারের নীতি, আইনি কাঠামো এবং ক্ষতিপূরণ পরিকল্পনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে সক্ষম হয়েছে। তবে নাসরীন জাহানের মতো কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনও অনিশ্চিত রয়ে গেছে, যা ভবিষ্যতে নতুন আলোচনার বিষয় হতে পারে। গুমের শিকারদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়া কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নির্বাচনের পর সরকারী দায়িত্বের অংশ হিসেবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
এই বৈঠকটি গুমের শিকার পরিবারগুলোর জন্য সরকারের নীতি ও পদক্ষেপ সম্পর্কে সরাসরি তথ্য সংগ্রহের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে কাজ করেছে এবং নির্বাচনের পর গুমের মামলায় সরকারের দায়িত্বশীলতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর প্রত্যাশা জাগিয়ে তুলেছে।



