প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস ৫ ফেব্রুয়ারি বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় একটি প্রতিবেদন হস্তান্তরের সময় সরকারি প্রতিষ্ঠানে কোনো দুর্নীতি না থাকার কঠোর নীতি ঘোষণা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, সেবা দ্রুত বাস্তবায়ন এবং ফাইল আটকে থাকার সংস্কৃতি দূর করতে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার অপরিহার্য। এই বক্তব্যের পটভূমি ছিল গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিট (জিআইইউ) কর্তৃক প্রস্তুত করা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন সংক্রান্ত প্রতিবেদন।
প্রতিবেদনটি জিআইইউ কর্তৃক প্রস্তুত করা হয়, যেখানে প্রশিক্ষণ সংস্থার কার্যকারিতা, ব্যবস্থাপনা ও সেবা মানের বিশ্লেষণ অন্তর্ভুক্ত। হস্তান্তরের সময় উপদেষ্টা কার্যালয় এই মূল্যায়ন ফলাফল উপস্থাপন করে, যা ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। তিনি জোর দেন, প্রযুক্তি‑নির্ভর পদ্ধতি নাগরিকের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়ার মূল চাবিকাঠি।
এই ঘোষণার পূর্বে, ১০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় প্রশিক্ষণ কাউন্সিলের নবম সভায় একই উপদেষ্টা জনশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ সংস্থার মানোন্নয়নের নির্দেশনা দেন। ঐ সভায় তিনি উল্লেখ করেন, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ ছাড়া সরকারি সেবার গুণগত মান উন্নত করা সম্ভব নয়। সেই নির্দেশনা অনুসরণে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এর কারিগরি সহায়তায় জিআইইউ মূল্যায়ন কার্যক্রম সম্পন্ন করে।
মূল্যায়নের আওতায় প্রথমে পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন মন্ত্রণালয়ের অধীনে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেগুলো হল বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি), বিসিএস প্রশাসন একাডেমি, বিয়াম ফাউন্ডেশন, জাতীয় উন্নয়ন প্রশাসন একাডেমি (নাডা) এবং জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমি (এনএপিডি)। এই সংস্থাগুলোর কার্যক্রম, প্রশিক্ষণ পদ্ধতি ও ফলাফল বিশদভাবে পর্যালোচনা করা হয়।
বৈঠকে উপদেষ্টা স্পষ্টভাবে বলেন, সরকারি সার্ভিসে কোনো ধরনের দুর্নীতি সহ্য করা হবে না এবং এই নীতি প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের মধ্যেও অগ্রাধিকার পাবে। তার মতে, নাগরিকের সেবা সরাসরি সরকারের কাছ থেকে না, সরকারের সেবা নাগরিকের কাছে পৌঁছানোই মূল লক্ষ্য। এ জন্য সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া দ্রুততর ও স্বচ্ছ করা জরুরি।
প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার বর্তমান সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, অনেক প্রতিষ্ঠানে ভবন থাকলেও দক্ষ কর্মী বা আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতি অনুপস্থিত। তিনি বলেন, প্রচলিত রুটিন প্রশিক্ষণ বদলে সমস্যা সমাধানমূলক (প্রবলেম সলভিং) পদ্ধতি গ্রহণ করা উচিত। এভাবে প্রশিক্ষণগ্রহীতারা বাস্তব কাজের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুত হবে।
মূল্যায়নের ফলাফলের ভিত্তিতে উপদেষ্টা স্কোরিং, ইনসেনটিভ ও র্যাংকিং ব্যবস্থা প্রবর্তনের পরামর্শ দেন। তিনি যুক্তি দেন, পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে পুরস্কার ও প্রণোদনা প্রদান করলে সংস্থার কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি, র্যাংকিং সিস্টেমের মাধ্যমে সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আলাদা করে তুলে ধরা যাবে।
বেসরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও এই প্রশিক্ষণ থেকে গর্ববোধ করতে পারবে, এমন পরিবেশ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তিনি জোর দেন। তার মতে, প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর স্বীকৃতি ও ক্যারিয়ার উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করা উচিত, যাতে পাবলিক ও প্রাইভেট সেক্টরের মধ্যে সমতা বজায় থাকে।
প্রতিবেদনটি প্রশিক্ষণ সংস্থার গুণগত মান, প্রশিক্ষণ পদ্ধতি ও ফলাফল বিশ্লেষণ করে, উন্নয়নের ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে। জিআইইউ ভবিষ্যতে এই মূল্যায়নকে ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করবে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কর্মপরিকল্পনা সংশোধন করবে।
এই উদ্যোগটি বাংলাদেশ সরকারের দুর্নীতি‑মুক্ত সেবা নিশ্চিত করার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পূর্বে সরকার দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়ম মোকাবেলায় বিভিন্ন নীতি প্রণয়ন করেছে; আজকের ঘোষণায় প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সংস্কারকে মূল কৌশল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
পরবর্তী ধাপে জিআইইউ সংস্থাগুলোর বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করবে, ফলাফল ভিত্তিক নীতি সমন্বয় করবে এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি সমর্থন প্রদান করবে। উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সরকারি সেবা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
সারসংক্ষেপে, প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নির্দেশনা অনুসারে সরকার এখন প্রশিক্ষণ সংস্থার মানোন্নয়ন, দুর্নীতি নির্মূল এবং সেবা দ্রুত পৌঁছানোর জন্য প্রযুক্তি‑নির্ভর পদ্ধতি গ্রহণে অগ্রসর। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে পাবলিক সেক্টরের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং নাগরিকের সেবা অভিজ্ঞতা উন্নত হবে।



