বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসারস ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল (বিবিওডব্লিউসি) পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ছাড়া আর্থিক খাতের টেকসই সংস্কার অসম্ভব বলে দাবি জানায়। তারা ১৯৭২ সালের ব্যাংক অর্ডার ও ১৯৯১ সালের ব্যাংক কোম্পানি আইনের ব্যাপক পরিবর্তনের জন্য সাতটি ধাপের প্রস্তাব পেশ করে।
বিবিওডব্লিউসির নেতৃত্বে থাকা কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার পরিকল্পনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনকে মূল স্তম্ভ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। তবে সরকারী মেয়াদ শেষের দিকে পৌঁছলেও স্বায়ত্তশাসন সংক্রান্ত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে।
কাউন্সিলের মতে, প্রথম স্মারকলিপি আগস্ট ২০২৪-এ অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের কাছে পাঠানো হয়। এরপর ১৯ মার্চ ও ৫ নভেম্বর ২০২৫-এ গভার্নরকে স্বায়ত্তশাসন ও সংস্কার সংক্রান্ত একাধিক অনুরোধ জানানো হয়। সর্বশেষে ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫-এ অপ্রয়োজনীয় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলের দাবি করা হয়। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের হয়রানির শিকার না হওয়ার জন্য সুরক্ষারও আবেদন করা হয়।
সাতটি মূল প্রস্তাবের মধ্যে প্রথমটি ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধন করে সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা। দ্বিতীয় প্রস্তাবে গভার্নরের পদকে মন্ত্রী সমান মর্যাদা এবং ডেপুটি গভার্নর ও বিএফআইইউ প্রধানের পদকে সিনিয়র সচিবের সমমর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। তৃতীয় প্রস্তাবে গভার্নর ও ডেপুটি গভার্নরের নিয়োগে সার্চ কমিটি বা সংসদীয় কমিটির সুপারিশ বাধ্যতামূলক করা এবং অপসারণের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি নেতৃত্বে তদন্তের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
চতুর্থ প্রস্তাবটি বেসরকারি ব্যাংকে পারিবারিক প্রভাব কমানো এবং পরিচালকদের মেয়াদ সীমিত করার দিকে লক্ষ্য রাখে। এটি শেয়ারহোল্ডার গঠন ও শাসন কাঠামোর স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। পঞ্চম প্রস্তাবে ডেপুটি গভার্নরের একটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়, যেখানে পর্যবেক্ষকের ভোটিং ক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকের অনিয়মের জন্য কর্মকর্তাদের দায়ী করা হচ্ছে; ফলে কর্মকর্তাদের মধ্যে ভীতির পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
ষষ্ঠ প্রস্তাবটি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সম্পূর্ণ বিরোধিতা না করে, তা স্বচ্ছ মূল্যায়নের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া উচিত বলে জোর দেয়। সপ্তম প্রস্তাবে স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি আর্থিক খাতের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা ও বাজারের আস্থা বৃদ্ধি করার লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
বিবিওডব্লিউসির দাবিগুলি আর্থিক বাজারে তাত্ক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে। স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত হলে নীতি নির্ধারণে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমে, যা বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়াবে এবং ঋণদানের শর্তগুলোতে স্বচ্ছতা আনবে। অন্যদিকে, স্বায়ত্তশাসনের দেরি হলে বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ে, যা মূলধন প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
স্বায়ত্তশাসন না পেলে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও তহবিলের গুণগত মান হ্রাস পেতে পারে। বিশেষ করে বেসরকারি ব্যাংকে পারিবারিক প্রভাব কমাতে না পারলে শেয়ারহোল্ডার বিরোধ ও দায়িত্বশীলতা হ্রাস পাবে, যা ঋণ ডিফল্টের ঝুঁকি বাড়াবে।
কাউন্সিলের দাবি অনুযায়ী, গভার্নর ও ডেপুটি গভার্নরের নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হলে নেতৃত্বের স্বতন্ত্রতা ও দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া, অপসারণের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নেতৃত্বে তদন্তের ব্যবস্থা করলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা কমে যাবে।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ মূল্যায়ন প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করলে দক্ষতা ও পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে নিয়োগ হবে, যা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নত করবে। এটি দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকের কার্যকরী দক্ষতা বাড়াবে এবং গ্রাহক সেবার মান উন্নত করবে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত হলে বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রা নীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আরও স্বতন্ত্রভাবে কাজ করতে পারবে। ফলে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রিজার্ভ ম্যানেজমেন্ট ও লিকুইডিটি সাপোর্টে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, স্বায়ত্তশাসনের দেরি হলে সরকারী হস্তক্ষেপের ঝুঁকি বাড়বে, যা আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার রেটিং ও বিনিয়োগের প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই স্বায়ত্তশাসন সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা দেশের আর্থিক সেক্টরের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিবিওডব্লিউসি শেষ করে বলেন, স্বায়ত্তশাসন ও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া আর্থিক খাতের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় এবং তারা সকল চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।



