ঢাকার মতিঝিলে FBCCI (ফেডারেশন অফ বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি) ও আইবিএফবি (ইন্ডাস্ট্রি বেসড ফাইন্যান্সিয়াল বডি) সমন্বয়ে ৫ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার একটি বিশদ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল এলডিসি (কম উন্নত দেশ) থেকে উন্নয়নের পথে ব্যবসায়িক পরিবেশের মৌলিক সংস্কার নিয়ে মতবিনিময় করা।
সভার সভাপতিত্ব করেন FBCCI প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুর রহিম খান, যিনি অংশগ্রহণকারীদের স্বাগত জানিয়ে আলোচনার কাঠামো নির্ধারণ করেন। উপস্থিতি ছিল সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের পাশাপাশি নীতিনির্ধারক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের।
সিপিডি (সেন্টার ফর পলিসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) গবেষণা বিভাগের পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ব্যবসা পরিচালনার মোট ব্যয় হ্রাসের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি সেবার মান ও গতি বাড়ানো ছাড়া এলডিসি উত্তরণে টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়। বিশেষ করে কাস্টমস ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সরিয়ে দ্রুত সেবা প্রদান করা জরুরি।
ড. মোয়াজ্জেমের মতে, কাস্টমসের ক্লিয়ারেন্স সময় কমানো এবং লাইসেন্স প্রাপ্তির প্রয়োজনীয় নথিপত্র হ্রাস করলে রপ্তানি-আমদানি খাতের প্রতিযোগিতা বাড়বে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী সেবা ব্যবসায়িক খরচের অপ্রয়োজনীয় অংশ কমিয়ে বিনিয়োগের পরিবেশকে উজ্জীবিত করবে।
আইবিএফবি পরিচালক এম. এস. সিদ্দিকী ব্যবসায়িক ব্যর্থতাকে অপরাধের মতো গণ্য করার প্রবণতাকে প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, দেউলিয়া আইন যদিও রয়েছে, তার কার্যকর প্রয়োগের অভাবই ঋণগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের পুনরুদ্ধারকে কঠিন করে তুলছে। তাছাড়া, বর্তমান ট্রেড লাইসেন্সের কাঠামোকে অনধিকৃত হয়রানির উৎস হিসেবে উল্লেখ করে সংস্কারের প্রস্তাব দেন।
সিদ্দিকী আরও উল্লেখ করেন, সীমিত দায়বদ্ধতা সম্পন্ন কোম্পানিগুলোর পরিচালকদের ব্যক্তিগত গ্যারান্টি নেওয়ার পদ্ধতি আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এই প্রথা উদ্যোক্তাদের ঝুঁকি গ্রহণের ইচ্ছা কমিয়ে দেয় এবং নতুন বিনিয়োগের প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে। তিনি সুপারিশ করেন, গ্যারান্টি প্রয়োজনীয়তা হ্রাস করে আন্তর্জাতিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি গঠন করা উচিত।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (ডুডক) সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহিম সিস্টেমিক দুর্বলতা স্বীকার করে জানান, দুডক অতীতে দমনমূলক কার্যক্রমে বেশি জোর দিয়েছে, সচেতনতামূলক কাজের ঘাটতি রয়েছে। তিনি আশ্বাস দেন, কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া ব্যবসায়ীদের ওপর হয়রানি করা হবে না এবং ভুক্তভোগীর তথ্যসহ অভিযোগ দাখিলের আহ্বান জানান।
সচিবের বক্তব্যে উল্লেখিত হয়েছে, দুর্নীতির মূল উৎস হল প্রক্রিয়াগত অস্বচ্ছতা ও অনিয়মিত নিয়ন্ত্রণ। তাই তিনি ব্যবসায়িক সেক্টরে স্বচ্ছতা বাড়াতে তথ্যভিত্তিক অভিযোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
পররাষ্ট্র সচিব নজরুল ইসলাম তিনটি প্রধান সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন: প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আচরণগত পরিবর্তন এবং ডিজিটালাইজেশন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সব দাপ্তরিক কাজ অনলাইনে সম্পন্ন হলে দুর্নীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং ব্যবসায়িক লেনদেনের গতি বাড়বে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে লাইসেন্সের আবেদন, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ও কর সংক্রান্ত কাজ স্বয়ংক্রিয় হলে মানবিক ত্রুটি হ্রাস পাবে এবং সময়সীমা নির্ধারিত হবে। ফলে উদ্যোক্তারা দীর্ঘ অপেক্ষার চক্র থেকে মুক্ত হয়ে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমে মনোযোগ দিতে পারবে।
সভার সমাপনী বক্তব্যে FBCCI প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুর রহিম খান ন্যায্যতা ও দায়িত্বশীলতার ওপর জোর দেন। তিনি উল্লেখ করেন, বন্ড লাইসেন্সের অপব্যবহার রোধে কঠোর নিয়ম প্রয়োগ করা এবং ব্যবসা-সরকারের মধ্যে সমতা বজায় রাখা উন্নয়নের একমাত্র পথ। তিনি সকল অংশীদারকে যৌথভাবে সংস্কার বাস্তবায়নে কাজ করার আহ্বান জানান।
এই আলোচনার পর, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে দ্রুত নীতি পরিবর্তন ও প্রক্রিয়া সরলীকরণে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে কাস্টমস, লাইসেন্সিং ও দেউলিয়া আইনের কার্যকর প্রয়োগে ত্বরান্বিত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ব্যবসায়িক পরিবেশকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে ডিজিটাল সেবার বিস্তৃতি এবং নীতি সংস্কারের ধারাবাহিকতা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



