২১শ শতাব্দীর শেষের দিকে ডিজিটাল উদ্ভাবনের দ্রুত বিস্তার সরকার, যোগাযোগ এবং দৈনন্দিন জীবনের পদ্ধতিকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োমেট্রিক সিস্টেম এবং ডেটা বিশ্লেষণ সরঞ্জাম নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা বাড়িয়ে তুললেও গোপনীয়তা ও নজরদারির উদ্বেগকে তীব্র করেছে। এই প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার সমন্বয় মানবাধিকার আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নতুন প্রযুক্তিগুলি শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সেবা দ্রুত প্রদান এবং তথ্যের সঠিক ব্যবহারকে সম্ভব করেছে। তবে একই সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্যের সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং বিশ্লেষণ প্রক্রিয়া গোপনীয়তার সীমানাকে ধীরে ধীরে সংকুচিত করছে। ফলে নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্ত গোপনীয়তা রক্ষার জন্য নতুন নীতিমালা প্রয়োজনীয়তা হিসেবে উদ্ভাসিত হয়েছে।
ডিজিটাল যুগে গোপনীয়তার ধারণা শারীরিক, তথ্যগত এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গোপনীয়তা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। ফোন, স্মার্টওয়াচ, স্মার্ট হোম ডিভাইসের ব্যাপক ব্যবহার ব্যক্তিগত তথ্যের প্রবেশদ্বারকে সহজতর করেছে। এই ডিভাইসগুলো প্রায়শই ব্যবহারকারীর জ্ঞাত না হয়ে ডেটা সংগ্রহ করে, যা গোপনীয়তার লঙ্ঘনকে অদৃশ্য করে তুলেছে।
বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ, মুখমণ্ডল সনাক্তকরণ সফটওয়্যার, অবস্থান ট্র্যাকিং এবং বৃহৎ পরিসরের ডেটা সংরক্ষণ এখন সাধারণ হয়ে উঠেছে। এসব প্রযুক্তি একক ব্যক্তিকে ক্রমাগত পর্যবেক্ষণ করার সক্ষমতা প্রদান করে। সরকারী সংস্থা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলি জাতীয় নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিশাল বায়োমেট্রিক ডেটাবেস ও নজরদারি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে।
এই ধরনের রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত নজরদারি ব্যবস্থা গোপনীয়তার প্রচলিত মানদণ্ডকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ব্যক্তিগত তথ্যের ব্যাপক সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ গোপনীয়তার মৌলিক অধিকারকে হুমকির মুখে রাখে, যা নাগরিকের স্বায়ত্তশাসন ও গোপনীয়তার স্বাভাবিক প্রত্যাশার বিপরীতে।
একই সময়ে “নজরদারি পুঁজিবাদ” নামে পরিচিত একটি প্রবণতা উদ্ভূত হয়েছে, যেখানে বেসরকারি কোম্পানি ব্যবহারকারীর ডেটা সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে। এই ডেটা বিজ্ঞাপন লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ, ব্যবহারকারীর আচরণ পূর্বাভাস এবং কন্টেন্ট মডারেশন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয়।
লক্ষ্যবস্তু বিজ্ঞাপন এবং অ্যালগরিদমিক কন্টেন্ট ফিল্টারিং ব্যবহারকারীর পছন্দ, মতামত এবং এমনকি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে। ডেটা-চালিত এই পদ্ধতি ব্যক্তিগত আচরণকে পূর্বাভাসযোগ্য করে তুলতে পারে, যা স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে।
ডিজিটাল অধিকার কেন্দ্রের মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো এই প্রবণতাকে সতর্কতা সহকারে পর্যবেক্ষণ করে এবং ডেটা সুরক্ষা ও গোপনীয়তা রক্ষার জন্য কঠোর আইন প্রণয়নের আহ্বান জানায়। তারা দাবি করে যে, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নিরাপত্তা বাড়াতে পারে, তবে তা নাগরিকের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ না করে করা উচিত।
বিশ্বব্যাপী বেশ কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে বায়োমেট্রিক ডেটার ব্যবহার সীমিত করতে, ডেটা সংরক্ষণ সময়সীমা নির্ধারণে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়ন করেছে। তবে এ ধরনের নীতিমালা প্রয়োগে প্রযুক্তি কোম্পানি ও সরকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন, যাতে গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করা যায়।
ভবিষ্যতে ডেটা বিশ্লেষণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার আরও জটিল হয়ে উঠবে, যা গোপনীয়তার সুরক্ষাকে আরও কঠিন করবে। তাই নাগরিক, নীতি নির্ধারক এবং প্রযুক্তি বিকাশকারীদের মধ্যে ধারাবাহিক সংলাপের মাধ্যমে গোপনীয়তার অধিকারকে শক্তিশালী করা জরুরি।
সারসংক্ষেপে, ডিজিটাল প্রযুক্তির অগ্রগতি নিরাপত্তা ও সেবার মান উন্নত করেছে, তবে একই সঙ্গে গোপনীয়তার নতুন হুমকি তৈরি করেছে। নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীল ডেটা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, এবং আইনগত কাঠামোকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মূল চাবিকাঠি হবে।



