বাংলাদেশ সরকার ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই চুক্তি দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক শুল্ক হ্রাস ও বাজার প্রবেশ সহজ করার লক্ষ্য নিয়ে গৃহীত হবে। স্বাক্ষর অনুষ্ঠানটি ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হবে, তবে বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান সরাসরি উপস্থিত থাকবেন না।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জানানো অনুযায়ী, ওয়াশিংটনে স্বাক্ষরের জন্য বাংলাদেশ থেকে পাঁচজনের একটি প্রতিনিধিদল পাঠানো হবে। দলের প্রধান হিসেবে অতিরিক্ত সচিব ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) অনুবিভাগের প্রধান খাদিজা নাজনীন নিয়োগ পেয়েছেন। দলের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে দুই যুগ্ম সচিব ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ ও মুস্তাফিজুর রহমান, সিনিয়র সহকারী সচিব শেখ শামসুল আরেফীন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কমিশনার রইছ উদ্দিন খান অন্তর্ভুক্ত।
প্রতিনিধিদলটি শুক্রবার ঢাকা থেকে রওনা হবে এবং ১০ ফেব্রুয়ারি বা তার কাছাকাছি সময়ে দেশে ফিরে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। ওয়াশিংটনে স্বাক্ষরিত চুক্তি বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্ক হ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি করবে, যা রপ্তানি খাতের আয় বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে আমদানি পণ্যের দামের হ্রাসের মাধ্যমে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অবদান রাখার আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, বাণিজ্য উপদেষ্টা ও বাণিজ্য সচিব আজ দুপুরে টোকিওর দিকে রওনা হয়েছেন। তারা ৪ থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে এমন বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি (বিজেইপিএ) স্বাক্ষরে অংশ নেবেন। এই চুক্তি জাপানের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ সম্পর্ককে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে গৃহীত, যেখানে উভয় দেশের পণ্য ও সেবার জন্য কাস্টমস সুবিধা প্রদান করা হবে।
টোকিওতে অংশগ্রহণকারী দলটিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) অনুবিভাগের প্রধান আয়েশা আক্তার, যুগ্ম সচিব ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ, উপসচিব মাহবুবা খাতুন মিনু এবং সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ হাসিব সরকার অন্তর্ভুক্ত। এই চারজনের সঙ্গে বাণিজ্য উপদেষ্টা ও সচিবের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে, যা চুক্তি আলোচনার সময় প্রযুক্তিগত ও নীতি সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে সরাসরি সমন্বয়কে সহজ করবে।
বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের সময়সূচি ও দল গঠন সম্পর্কে সরকারী আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ওয়াশিংটন ও টোকিও উভয় স্থানে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলো দেশের বাণিজ্যিক কৌশলে নতুন দিকনির্দেশনা যোগ করবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক হ্রাসের ফলে রপ্তানি-নির্ভর শিল্পগুলো, যেমন টেক্সটাইল ও জুতার শিল্প, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সুবিধা পাবে।
জাপান সঙ্গে অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে, উচ্চ প্রযুক্তি পণ্য ও সেবা রপ্তানির সুযোগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। জাপানি বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা উৎপাদন খাতে আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তরে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে জাপান থেকে আসা কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির খরচ কমে গেলে উৎপাদন খরচ হ্রাস পাবে।
দুই চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্যে সময়ের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও, উভয় চুক্তি একসাথে দেশের বাণিজ্যিক পরিবেশকে বহুমুখী করে তুলবে। শুল্ক হ্রাস ও বাজার প্রবেশের সুবিধা সরাসরি রপ্তানি বৃদ্ধিতে অবদান রাখবে, আর বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হলে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এই ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে জিডিপি বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে, স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগের জন্য বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করা হবে। টাস্ক ফোর্সটি চুক্তির শর্তাবলী অনুসারে শুল্ক হ্রাসের সময়সূচি, কাস্টমস প্রক্রিয়া সরলীকরণ এবং বিনিয়োগ সুবিধা প্রদান ইত্যাদি বিষয়গুলো তদারকি করবে। এভাবে চুক্তির সুবিধা দ্রুত ও কার্যকরভাবে দেশের অর্থনীতিতে প্রবেশ করানো সম্ভব হবে।
সারসংক্ষেপে, ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি এবং টোকিওতে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি দুটোই দেশের বাণিজ্যিক দিগন্তকে প্রসারিত করার লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছে। বাণিজ্য উপদেষ্টা ও সচিবের সরাসরি অংশগ্রহণ না থাকলেও, প্রতিনিধিদলের মাধ্যমে চুক্তি সম্পন্ন হবে এবং পরবর্তী পর্যায়ে বাস্তবায়নমূলক কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে। এই পদক্ষেপগুলো দেশের রপ্তানি ও বিনিয়োগ প্রবাহকে উত্সাহিত করে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত করবে।



