ঢাকা, ৫ ফেব্রুয়ারি – ব্যবসা পরিবেশে নৈতিকতা বজায় রাখতে সরকারী উদ্যোগের মুখে অননুমোদিত অর্থপ্রদানের বৃদ্ধি নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এই বিষয়টি কেন্দ্রীয় নীতি সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, যিনি আজ ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসি) ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা ফোরাম (আইবিএফ) যৌথভাবে আয়োজিত ‘ব্যবসা পরিবেশে নৈতিক চর্চা’ শিরোনামের রাউন্ডটেবিলে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
মোয়াজ্জেম উল্লেখ করেন, লাইসেন্স, কমপ্লায়েন্স ও ইউটিলিটি সেবার ক্ষেত্রে এখনও অনেক অফিসে সরাসরি গিয়ে কাজ সম্পন্ন করতে বলা হয়, যা সিস্টেমের ম্যানুয়াল প্রকৃতি বজায় রাখে এবং অননুমোদিত পেমেন্টের সুযোগ তৈরি করে। আধা-ডিজিটালাইজেশন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, কর্মকর্তাদের বিচারের স্বাধীনতা ও শারীরিক উপস্থিতি বাধ্যতামূলক হওয়ায় এই সমস্যার সমাধান হয়নি।
এই পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার জন্য তিনি ব্যবসা প্রক্রিয়ার পুনর্গঠন প্রস্তাব করেন। প্রক্রিয়ার ধাপগুলোকে সরলীকরণ, পুনরাবৃত্তি কমানো এবং অনানুষ্ঠানিক খরচ হ্রাসের মাধ্যমে ব্যবসা করার খরচ কমানো সম্ভব হবে বলে তিনি বলেন। বিশেষ করে নথি, যাচাই এবং পেমেন্টের সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশনকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, যাতে মানবিক হস্তক্ষেপ কমে এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়।
মোয়াজ্জেম আরও জানান, বাংলাদেশ ব্যবসা ক্ষেত্র একসঙ্গে দুইটি বড় পরিবর্তনের মুখোমুখি। প্রথমটি হল রাজনৈতিক পরিবর্তন, যেখানে নতুন নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণের প্রত্যাশা রয়েছে। দ্বিতীয়টি হল দেশের সর্বশেষে কম উন্নত দেশ (এলডিসি) তালিকা থেকে সরে যাওয়া, যা এই বছর নভেম্বর মাসে সম্পন্ন হবে বলে অনুমান।
এই দুই পরিবর্তন ব্যবসা সম্প্রদায়কে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে ভিন্নভাবে যোগাযোগ স্থাপন করতে বাধ্য করবে। তিনি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোকে দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে এবং নীতিনির্ধারকদের কাছে স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে আহ্বান জানান।
মোয়াজ্জেমের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেরি ও বিচারের স্বাধীনতা বাড়ার ফলে অননুমোদিত পেমেন্টের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পূর্বের তুলনায় ব্যবসা পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলেছে। এই প্রবণতা নৈতিক ব্যবসা চর্চাকে দুর্বল করে এবং বিনিয়োগের আকর্ষণ কমিয়ে দেয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সেক্রেটারি নাজরুল ইসলামও একই আলোচনায় অংশ নেন এবং উল্লেখ করেন, দেশের সংস্থাগত সংস্কার ও আচরণগত পরিবর্তন অপরিহার্য, বিশেষ করে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন এবং এলডিসি থেকে সরে যাওয়ার সময়কালে। তিনি দেশকে তার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অবস্থান করিয়ে দিয়েছেন।
ইসলামের মতে, এই সংবেদনশীল সময়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীলতা এবং নৈতিক মানদণ্ডকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বজায় থাকে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নীতি ও প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞরা একমত যে, সম্পূর্ণ ডিজিটাল সিস্টেমের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে আইটি অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতা প্রোগ্রাম জরুরি। এছাড়া, অননুমোদিত পেমেন্টের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে দুর্নীতির সুযোগ কমে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, যদি এই সংস্কারগুলো দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, তবে ব্যবসা করার খরচ কমে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ বাড়বে। অন্যদিকে, সংস্কার বিলম্বিত হলে ব্যবসা পরিবেশের অবনতি অব্যাহত থাকবে, যা কর্মসংস্থান ও জিডিপি বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করবে।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশ এখন নৈতিক ব্যবসা চর্চা রক্ষার জন্য প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের দ্বিগুণ চ্যালেঞ্জের মুখে। সরকার, ব্যবসা গোষ্ঠী এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া অননুমোদিত পেমেন্টের প্রবণতা থামানো কঠিন হবে। এই মুহূর্তে গৃহীত পদক্ষেপগুলোই দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক দিকনির্দেশ নির্ধারণ করবে।



