ওয়াশিংটন পোস্ট, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক, বুধবার একসঙ্গে প্রায় এক‑তৃতীয়াংশ কর্মীকে চাকরি থেকে বাদ দিয়েছে। এই পদক্ষেপে সংবাদকর্মী, সম্পাদকীয় কর্মী এবং সহায়ক স্টাফসহ বিভিন্ন বিভাগ অন্তর্ভুক্ত, এবং একদিনে প্রায় ৩৩ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সূত্র অনুযায়ী, ছাঁটাইকৃত কর্মীদের মধ্যে সংবাদকক্ষের কর্মী সংখ্যা ৩০০‑এর বেশি, যা পত্রিকাটির মূল সংবাদ উৎপাদনের ক্ষমতাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। এই ব্যাপক হ্রাসের ফলে ওয়াশিংটন পোস্টের দৈনন্দিন প্রকাশনা ও ডিজিটাল কন্টেন্টের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
কর্মী হ্রাসের পরিসর জেফ বেজোসের ওপর সমালোচনার তীব্রতা বাড়িয়ে দিয়েছে। বেজোস, যিনি ২০১৩ সালে পত্রিকাটির মালিকানা গ্রহণের পর থেকে তার কৌশলগত দিকনির্দেশনা নিয়ে নানা মতামত পেয়েছেন, এখন তার নেতৃত্বের প্রশ্নের মুখোমুখি। কিছু সাংবাদিক ও শিল্প বিশ্লেষক বেজোসের সম্ভাব্য বিক্রয় পরিকল্পনা নিয়ে অনুমান করছেন, আবার অন্যরা আশা করছেন যে তিনি এই সংকটের সমাধানে পদক্ষেপ নেবেন।
দ্য পোস্ট গিল্ড, পত্রিকাটির কর্মী ইউনিয়ন, একটি বিবৃতি প্রকাশ করে উল্লেখ করেছে যে, যদি বেজোস আর পত্রিকাটিতে বিনিয়োগ চালিয়ে না যান, তবে নতুন কোনো অভিভাবকের প্রয়োজন হবে। গিল্ডের মতে, ওয়াশিংটন পোস্ট বহু প্রজন্ম ধরে সংবাদ মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং এর পাঠকগণ এখনও পত্রিকাটির সেবার ওপর নির্ভরশীল।
বেজোসের কাছ থেকে এই বিষয়ে কোনো সরাসরি মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে জানানো হয়েছে যে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে পত্রিকাটির ব্যবস্থাপনা দলকে বার্ষিক ক্ষতি কমিয়ে পুনরায় লাভজনক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য টেকসই কৌশল অনুসন্ধানের পরামর্শ দিয়েছেন। এই পরামর্শের ভিত্তিতে পত্রিকাটি আর্থিক পুনর্গঠন এবং খরচ হ্রাসের পরিকল্পনা চালু করেছে।
ছাঁটাইকৃত কর্মীদের তালিকায় আন্তর্জাতিক বিষয়ক জ্যেষ্ঠ কলামিস্ট ঈশান থারুরের নামও অন্তর্ভুক্ত। তিনি পত্রিকায় বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ ও মতামত প্রকাশ করে আসছেন এবং তার কলামগুলো পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
ঈশান থারুরের পিতামাতা হলেন ভারতের কংগ্রেস নেতা শশী থারুর, যিনি সংসদ সদস্য হিসেবে দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। পিতার রাজনৈতিক প্রভাব ও পুত্রের সাংবাদিকতা ক্যারিয়ার উভয়ই দেশের মিডিয়া ও রাজনীতিতে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
ঈশান নিজেই এক্স (পূর্বে টুইটার) প্ল্যাটফর্মে তার চাকরি হারানোর তথ্য শেয়ার করেছেন, যেখানে তিনি সংক্ষিপ্তভাবে এই সিদ্ধান্তের প্রতি তার শোক প্রকাশ করেছেন এবং পত্রিকাটির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার পোস্টটি মিডিয়া পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যা ওয়াশিংটন পোস্টের মানবসম্পদ নীতির ব্যাপক বিশ্লেষণের দরজা খুলে দেয়।
এই ছাঁটাই পদক্ষেপটি বৃহত্তর মিডিয়া শিল্পের আর্থিক চ্যালেঞ্জের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিজ্ঞাপন আয়ের হ্রাস, ডিজিটাল সাবস্ক্রিপশন মডেলের পরিবর্তন এবং পাঠকের আচরণের পরিবর্তন সবই সংবাদমাধ্যমের আয় কাঠামোকে চাপের মধ্যে ফেলেছে। ওয়াশিংটন পোস্টের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন টেকসই মডেল গড়ে তোলার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন যে, কর্মী হ্রাসের ফলে স্বল্পমেয়াদে ব্যয় কমে যাবে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সংবাদ গুণমান ও পাঠক সন্তুষ্টিতে প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক ও অভিজ্ঞ সাংবাদিকের প্রস্থান পত্রিকাটির বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি হ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি করে।
ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন পোস্টের বাজার অবস্থান নির্ভর করবে নতুন বিনিয়োগের উৎস, ডিজিটাল রূপান্তরের গতি এবং পাঠক ভিত্তি পুনরুদ্ধারের উপর। যদি বেজোস বা অন্য কোনো বিনিয়োগকারী দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক সমর্থন প্রদান না করেন, তবে পত্রিকাটিকে বিক্রয় বা কৌশলগত অংশীদারিত্বের পথে যেতে হতে পারে। এদিকে, বর্তমান কর্মী হ্রাসের ফলে প্রকাশনা শিল্পে কর্মসংস্থান নিরাপত্তা ও শ্রমিক অধিকার নিয়ে আলোচনা তীব্রতর হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ওয়াশিংটন পোস্টের একদিনে এক তৃতীয়াংশ কর্মী ছাঁটাই, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক কলামিস্ট ঈশান থারুরের প্রস্থান, মিডিয়া শিল্পের আর্থিক সংকটের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, বিনিয়োগের দিকনির্দেশনা এবং মানবসম্পদ নীতি এখন শিল্পের অন্যান্য খেলোয়াড়দের জন্যও নজরদারির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।



