ভারতে ১৬ বছরের নিচে শিশুরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য স্তরে নীতি নির্ধারণের প্রক্রিয়া দ্রুত এগোচ্ছে। বিভিন্ন রাজ্য অস্ট্রেলিয়ার কঠোর বয়স সীমা নির্ধারণের আইনের দিকে নজর দিয়ে নিজস্ব নিয়মাবলী পর্যালোচনা করছে। একই সঙ্গে, কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থনৈতিক সমীক্ষা এই বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে বয়সভিত্তিক সীমা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে।
অস্ট্রেলিয়া বিশ্বে প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের নিচে শিশুরা অধিকাংশ সামাজিক প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। নতুন আইনের অধীনে প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবহারকারীর বয়স যাচাই করতে হবে এবং অপ্রাপ্তবয়স্কের অ্যাকাউন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করতে হবে। এই মডেলটি অন্যান্য দেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য রেফারেন্স হিসেবে কাজ করছে।
ফ্রান্সের নিম্নকক্ষও সাম্প্রতিক সময়ে ১৫ বছরের নিচে শিশুরা সামাজিক মিডিয়া ব্যবহার নিষিদ্ধ করার একটি বিল পাস করেছে, যা এখন সিনেটের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। যুক্তরাজ্য সরকারও অনুরূপ নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে গম্ভীরভাবে আলোচনা চালাচ্ছে। এই আন্তর্জাতিক উদাহরণগুলো ভারতের নীতি আলোচনায় প্রভাব ফেলছে।
ভারতের অর্থনৈতিক সমীক্ষা, যা প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টার নেতৃত্বে প্রস্তুত হয়েছে, কেন্দ্রীয় সরকারকে শিশুদের জন্য সামাজিক মিডিয়া বয়সসীমা নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করতে আহ্বান জানায়। যদিও এই সুপারিশ বাধ্যতামূলক নয়, তবে নীতি গঠনে তা গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে কাজ করতে পারে।
দক্ষিণ ভারতের দুটি রাজ্যের মন্ত্রী সম্প্রতি প্রকাশ্যে বলছেন, বয়সসীমা নির্ধারণের কার্যকারিতা যাচাই করার জন্য তারা অস্ট্রেলিয়ার আইনের প্রভাব বিশ্লেষণ করছেন। তারা উল্লেখ করেছেন, এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলবে তা নির্ধারণে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
অন্ধ্রপ্রদেশের তেলুগু দেশম পার্টি (টিডিপি) সংসদ সদস্য এলএসকে দেভারায়ালু পার্লামেন্টে একটি প্রাইভেট বিল উপস্থাপন করেন, যেখানে ১৬ বছরের নিচে শিশুকে সামাজিক মিডিয়া থেকে দূরে রাখার প্রস্তাব রয়েছে। যদিও প্রাইভেট বিলের মাধ্যমে আইনগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম, তবু এটি জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা উস্কে দিয়েছে।
অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক আইনসমূহের পর্যালোচনার জন্য একটি বিশেষ দল গঠন করেছে। এই দল মেটা, গুগল এবং এক্সের মতো বড় প্ল্যাটফর্মগুলোকে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাজ্যের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী নারা লোকেশ উল্লেখ করেন, শিশুরা ক্রমাগত সামাজিক মিডিয়া ব্যবহার করে তাদের মনোযোগের ক্ষমতা ও পাঠ্যাভ্যাসে গুরুতর ক্ষতি হচ্ছে। তিনি বলেন, এই প্রবণতা শিক্ষার মান ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিভিন্ন রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় নীতি নির্ধারক এখন বয়স যাচাই প্রযুক্তি, প্ল্যাটফর্মের দায়িত্ব এবং সম্ভাব্য আইনি কাঠামো নিয়ে বিশদ আলোচনা চালাচ্ছেন। এই আলোচনায় প্রযুক্তিগত বাস্তবায়নযোগ্যতা ও ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হিসেবে উঠে এসেছে।
মেটা, গুগল এবং এক্সের মতো প্রধান সামাজিক নেটওয়ার্কগুলো ইতিমধ্যে বয়স যাচাই প্রক্রিয়া উন্নত করার জন্য গবেষণা চালাচ্ছে, তবে সরকারী নির্দেশনা না পেলে তারা বাধ্যতামূলকভাবে এই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে না। তাই, সরকার ও প্ল্যাটফর্মের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত করছেন, যদি বয়সসীমা নির্ধারণের আইন কার্যকর হয়, তবে তা শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা বাড়াতে এবং মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে একই সঙ্গে, অতিরিক্ত সীমাবদ্ধতা ডিজিটাল সাক্ষরতা ও তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ সীমিত করতে পারে, তাই নীতি গঠনে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
অবশেষে, ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার এখন আন্তর্জাতিক উদাহরণ, অর্থনৈতিক সমীক্ষার সুপারিশ এবং স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে একটি সমন্বিত নীতি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এই প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত কী রূপ নেবে, তা সময়ের সাথে সাথে স্পষ্ট হবে।



