২০২৪ সালের জুলাই মাসে ঢাকা শহরে তরুণ শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে এক বিশাল প্রতিবাদে রাহাত হোসেন নামের এক যুবক বন্ধুকে রক্ষা করতে গুলি থেকে বাঁচতে গিয়ে নিজের পা গুলিবিদ্ধ করেন। ঘটনা ২০ জুলাই ঘটেছে এবং রাহাতের বন্ধুকে গুলিবিদ্ধ করে অচেতন অবস্থায় ফেলতে হয়, ফলে রাহাতের জীবন রক্ষা পায়। এই সহিংসতা দ্রুত দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে বিস্তৃত হয়ে একটি জাতীয় গণবিক্ষোভের রূপ নেয়, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল রাজধানী ঢাকা।
বিক্ষোভের দুই সপ্তাহের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয় এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ঐ বিক্ষোভে প্রায় ১,৪০০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছে। সরকার পতনের পর কিছু ছাত্রনেতা অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত হন এবং তারা পূর্বে দাবি করা রাজনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে, তরুণ শিক্ষার্থী ও কর্মীরা একটি নতুন রাজনৈতিক সংগঠন গঠন করেন, যার নাম জাতীয় নাগরিক দল। এই দলটি মূলত স্বৈরাচারী শাসনের অবসান এবং ন্যায়সঙ্গত সমাজ গঠনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে দলটির অভ্যন্তরীণ বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে; নেতৃত্বের মধ্যে মতবিরোধ এবং কৌশলগত অমিল দেখা দেয়।
দলের মধ্যে নারীদের অংশগ্রহণও সীমিত থাকে, যদিও প্রাথমিক পর্যায়ে তারা সমান অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ায়, বংশগত রাজনৈতিক দলগুলো—যেমন জাতীয় নাগরিক দল ছাড়া—শূন্যস্থান পূরণে এগিয়ে আসে এবং নির্বাচনের জন্য শক্তিশালী প্রার্থী প্রস্তুত করে।
রাহাত হোসেন, যিনি নিজে গুলিবিদ্ধ হয়ে বেঁচে ছিলেন, সম্প্রতি বিবিসিকে জানিয়েছেন যে অন্তর্বর্তী সরকার তার প্রত্যাশিত “শান্তি, সাম্য এবং ন্যায়বিচারের সুন্দর বাংলাদেশ” গড়তে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, যদিও প্রাথমিকভাবে সরকারী চাকরির কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তবে তা দ্রুত স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটানোর বৃহত্তর লক্ষ্যে রূপান্তরিত হয়।
প্রতিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো এখন নির্বাচনের জন্য প্রস্তাবিত প্রোগ্রাম ও প্রার্থীদের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। তারা দাবি করে যে তরুণদের গঠিত নতুন দলগুলো অভিজ্ঞতা ও সংগঠনগত কাঠামোর অভাবে ভোটারদের আস্থা অর্জনে অক্ষম। একই সঙ্গে, জাতীয় নাগরিক দলের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং নারীদের সীমিত অংশগ্রহণকে তারা দলের ভবিষ্যৎ প্রভাবকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কারণ হিসেবে উপস্থাপন করে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন, যদি জাতীয় নাগরিক দল নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য স্থান না পায়, তবে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে পুরোনো দলগুলোর আধিপত্য বজায় থাকবে এবং তরুণদের দাবিগুলো ধীরে ধীরে পেছনে সরে যাবে। তবে রাহাত ও তার সমবয়সীরা এখনও বিশ্বাস করে যে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান এবং ন্যায়সঙ্গত শাসন গড়ে তোলার আন্দোলন অব্যাহত থাকবে, যদিও তা এখনো রাজনৈতিক মঞ্চে পূর্ণ শক্তি পায়নি।
আসন্ন নির্বাচনের ফলাফল দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যদি জাতীয় নাগরিক দল সুষ্ঠু সংগঠন গঠন করে এবং নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে, তবে তারা পুরোনো দলগুলোর সঙ্গে সমান প্রতিযোগিতা করতে পারে। অন্যথায়, তরুণদের গঠিত নতুন শক্তি রাজনৈতিক প্রান্তরে প্রান্তিক হয়ে রয়ে যাবে, এবং স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের স্বপ্ন এখনও পূর্ণতা পায়নি।
সামগ্রিকভাবে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণবিক্ষোভ থেকে শুরু করে বর্তমান নির্বাচনের প্রস্তুতি পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তরুণ ও পুরোনো উভয় শক্তির টানাপোড়েনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে। ভবিষ্যতে কীভাবে এই টানাপোড়েন সমাধান হবে, তা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সাফল্য নির্ধারণ করবে।



