বিশ্বব্যাপী সংঘাত, রাস্তায় ও সীমান্তে সহিংসতা, এবং মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে; এই পরিস্থিতিতে মানুষ স্ব-যত্নকে শূন্য বাক্য বলে মনে করতে পারে। যখন সম্প্রদায়গুলো আক্রমণের মুখে থাকে, যুদ্ধ, পুলিশ হিংসা, আর্থিক অস্থিরতা এবং কাঠামোগত অবহেলা দৈনন্দিন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়, তখন নিজের যত্ন নেওয়ার ধারণা একধরনের অবাস্তব প্রতিশ্রুতি হিসেবে শোনায়। তবে এ সময়ই স্ব-যত্নের গভীর, নৈতিক ভিত্তি থাকা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন, যা কেবল ব্যক্তিগত স্বস্তি নয়, সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্ব-যত্নের ধারণা মূলত বাজারজাত পণ্য ও সেবার সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেখা যায়। ফেস মাস্ক, দামী কফি, সুগন্ধি মোমবাতি, উৎপাদনশীলতা রিট্রিট এবং “মি-টাইম” প্লেলিস্টের মতো কার্যক্রমকে স্ব-যত্নের মূল রূপ হিসেবে প্রচার করা হয়। এই প্রবণতা ব্যক্তিগত চাহিদাকে বাণিজ্যিক পণ্য দিয়ে পূরণ করার দিকে ঝুঁকে থাকে, ফলে স্ব-যত্নের প্রকৃত অর্থ থেকে দূরে সরে যায়।
নিয়োলিবেরাল অর্থনীতির কাঠামোতে স্ব-যত্নকে প্রায়শই ব্যক্তিগত উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর একটি টুল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। শরীরকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, শক্তি সর্বোচ্চভাবে ব্যবহার করা এবং নিজেকে আরও কার্যকরী করে তোলার প্রচেষ্টা স্ব-যত্নকে আরেকটি স্ব-পরিচালনা প্রকল্পে রূপান্তরিত করে। এভাবে স্ব-যত্নকে একক ব্যক্তিগত কাজ হিসেবে দেখা হলে, বৃহত্তর সামাজিক কষ্ট ও কাঠামোগত হিংসার বাস্তবতা উপেক্ষা করা হয়।
এই বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিবাদী ব্যাখ্যার বিপরীতে স্ব-যত্নের আরেকটি ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ রয়েছে, যা কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। এই আন্দোলনের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী এবং প্রান্তিক গোষ্ঠীর মানুষ কেবল হিংসা ও বৈষম্যের মুখোমুখি নয়, তারা স্ব-যত্নের মাধ্যমে টিকে থেকেছেন। তাদের জন্য স্ব-যত্ন কেবল আরাম নয়, বরং আত্মরক্ষার একটি কৌশল, যা জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে সহায়তা করে।
কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদী কবি ও কর্মী অড্রে লর্ডের মতে, নিজের যত্ন নেওয়া স্ব-সন্তোষ নয়, বরং আত্মরক্ষার একটি রাজনৈতিক কাজ। তিনি নিজের স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে লড়াই করার সময়ও এই ধারণা বজায় রেখেছিলেন, যেখানে তিনি দেখিয়েছেন যে স্ব-যত্নকে সামাজিক ন্যায়বিচারের অংশ হিসেবে দেখা হলে তা ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত উভয় স্তরে শক্তি প্রদান করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি স্ব-যত্নকে কেবল ব্যক্তিগত স্বস্তি নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের জন্য একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে পুনর্গঠন করে।
স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) স্ব-যত্নকে নিজের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়ার একটি মৌলিক উপায় হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে, যা রোগ প্রতিরোধ ও সুস্থতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে যে সমষ্টিগত স্ব-যত্নের অনুশীলন, যেমন সমবায়িক সমর্থন গোষ্ঠী, শেয়ার করা শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশল এবং পারস্পরিক সহায়তা, মানসিক চাপ কমাতে এবং রোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে সহায়ক। তাই স্ব-যত্নকে কেবল ব্যক্তিগত রুটিন নয়, বরং সম্প্রদায়ের স্তরে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
প্রায়োগিকভাবে, এই রূপান্তরিত স্ব-যত্নের জন্য কিছু সহজ পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রথমত, ব্যক্তিগত বিশ্রাম ও পুনরুজ্জীবনের সময়কে সামাজিক সংযোগের সঙ্গে যুক্ত করা, যেমন প্রতিবেশী বা সহকর্মীদের সঙ্গে ছোট সমাবেশে অংশ নেওয়া। দ্বিতীয়ত, আর্থিক ও সময়ের সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করে কম খরচের স্ব-যত্ন কার্যক্রম, যেমন স্থানীয় পার্কে হাঁটা, সাশ্রয়ী যোগব্যায়াম বা শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন গ্রহণ করা। তৃতীয়ত, সম্প্রদায়ের মধ্যে তথ্য শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত রিসোর্স ও সমর্থন গোষ্ঠীর তথ্য সহজলভ্য হবে। এ ধরনের সমষ্টিগত উদ্যোগ স্ব-যত্নকে সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে যুক্ত করে, যা ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত উভয় স্তরে স্থিতিশীলতা বাড়ায়।
অবশেষে, বর্তমান সংকটের সময় স্ব-যত্নকে কেবল ব্যক্তিগত আরাম হিসেবে নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করা জরুরি। আপনার সম্প্রদায়ে কীভাবে স্ব-যত্নের এই রূপান্তরিত ধারণা বাস্তবায়ন করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করা এবং সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা কি আপনার পরবর্তী পদক্ষেপ হতে পারে?



