বিলিয়ন ডলার ক্লাবের সদস্য আটটি দেশীয়‑বিদেশি শিল্প গ্রুপের গত অর্থবছরে মোট আমদানি‑রপ্তানি লেনদেন ১,২৫৪ কোটি মার্কিন ডলার রেকর্ড করেছে, যা দেশের মোট বাণিজ্যিক লেনদেনের প্রায় ১১ শতাংশ গঠন করে। এই গ্রুপগুলো সমষ্টিগতভাবে সরকারকে ১৭,৮১৩ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব প্রদান করেছে এবং প্রায় পাঁচ লক্ষ কর্মীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছে।
নতুন কারখানা গড়ে তোলার ফলে কাঁচামালের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাঁচামাল আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের আমদানি‑রপ্তানি কার্যক্রমও সম্প্রসারিত হয়েছে। মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল উল্লেখ করেন, সম্প্রসারণের ফলে গ্রুপের বাণিজ্যিক পরিমাণে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে।
বিএনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, বসুন্ধরা গ্রুপ ২০২৩‑২৪ অর্থবছরে $১১২ কোটি আমদানি‑রপ্তানি লেনদেনের মাধ্যমে ক্লাবে স্থান পেয়েছিল। তবে পরবর্তী অর্থবছরে এই পরিমাণ $৫১ কোটি পর্যন্ত কমে যায়, মূলত ভোগ্যপণ্য ও ক্লিংকারসহ শিল্পের কাঁচামাল আমদানি হ্রাসের ফলে। মধ্যবর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর গ্রুপের বিভিন্ন অনিয়মের তদন্তে ডিইউডিক, সিআইডি এবং এনবিআরসহ সরকারি সংস্থাগুলো সক্রিয় হয়েছে।
ক্লাবের মধ্যে রপ্তানিতে শীর্ষে রয়েছে ইয়াংওয়ান, প্রাণ‑আরএফএল এবং স্কয়ার গ্রুপ। এই তিনটি সংস্থার আমদানি‑রপ্তানি লেনদেনে গত অর্থবছরে দ্বি‑অঙ্কের বৃদ্ধি দেখা গেছে, যা দেশের রপ্তানি সক্ষমতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বাকি পাঁচটি গ্রুপ মূলত আমদানি‑প্রতিস্থাপন শিল্পে নেতৃত্ব দিচ্ছে, ফলে দেশীয় উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে এবং সীমিত পরিসরে রপ্তানিও শুরু হয়েছে।
প্রাণ‑আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী বলেন, “আমরা যেসব সেক্টরে কাজ করি, সেখানে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। অতিরিক্ত বিনিয়োগের মাধ্যমে রপ্তানি আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।” এই মন্তব্যটি গ্রুপের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বাজারের সম্ভাবনা নির্দেশ করে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই) দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদনমুখী সেক্টরে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। গত অর্থবছরে গ্রুপ $২৩২ কোটি মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে এবং সরকারকে ৫,১৭৫ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব প্রদান করেছে, যা প্রায় $৪৩ কোটি সমান। মোট আমদানি ব্যয় $২৭৫ কোটি, আর রপ্তানি প্রায় $১৩ কোটি। ফলে মোট লেনদেন $২৮৩ কোটি, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধির পেছনে গ্রুপের ধারাবাহিক কারখানা সম্প্রসারণ ও নতুন উৎপাদন লাইন চালু করা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিলিয়ন ডলার ক্লাবে অন্তর্ভুক্ত এই আটটি গ্রুপের বাণিজ্যিক কার্যক্রম দেশের বাণিজ্যিক ভারসাম্য ও শিল্প কাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। কাঁচামাল আমদানি বাড়ার ফলে বৈদেশিক মুদ্রা চাহিদা বৃদ্ধি পায়, তবে একই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন বাড়ার ফলে আমদানি‑নির্ভরতা কমে। রপ্তানির দ্বিগুণ বৃদ্ধি এবং নতুন পণ্যের বাজারে প্রবেশ দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতামূলকতা বাড়াতে সহায়ক।
তবে কিছু ঝুঁকি অব্যাহত রয়েছে। কাঁচামালের আন্তর্জাতিক মূল্য ওঠানামা, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের অস্থিরতা এবং সরকারী নীতি পরিবর্তন গ্রুপগুলোর লেনদেনে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বসুন্ধরা গ্রুপের মতো সংস্থার ক্ষেত্রে আমদানি হ্রাসের প্রবণতা দেখায় যে ভোক্তা পণ্যের চাহিদা ও শিল্প কাঁচামালের সরবরাহে পরিবর্তন ঘটতে পারে।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিতে, এই গ্রুপগুলো যদি উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণে মনোযোগ দেয় এবং একই সঙ্গে রপ্তানি বাজারে সক্রিয়ভাবে প্রবেশ করে, তবে দেশের বাণিজ্যিক ঘাটতি কমাতে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও নীতি সমর্থন ছাড়া এই সম্ভাবনা পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হবে না।
সারসংক্ষেপে, বিলিয়ন ডলার ক্লাবের আটটি গ্রুপের বর্ধিত আমদানি‑রপ্তানি লেনদেন দেশের বাণিজ্যিক কাঠামোকে শক্তিশালী করছে, তবে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও নীতি ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য কৌশলগত পরিকল্পনা প্রয়োজন।



