চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মচারীরা মঙ্গলবার থেকে অনির্দিষ্টকালীন ধর্মঘট চালিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে বন্দর জুড়ে সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ধর্মঘটের মূল দাবি হল নতুন মোরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (NCT) কে দুবাই ভিত্তিক DP World‑কে লিজে দেওয়ার পরিকল্পনা বিরোধিতা করা। শিপিং উপদেষ্টা এসএম শাখাওয়াত হোসেন আজ বন্দর পরিদর্শন করে জরুরি বৈঠকের আয়োজন করবেন।
ধর্মঘটের পূর্বে কর্মীরা শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত আট ঘণ্টার কাজ বন্ধের প্রতিবাদ জানিয়েছিল। এই সময়ে NCT‑এর লিজ চুক্তি নিয়ে উদ্বেগের মুখে কর্মীরা সমবেত হয়ে প্রতিবাদসূচক কর্মসূচি গ্রহণ করে। লিজ চুক্তি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অধীনে পরিচালিত নতুন মোরিং কন্টেইনার টার্মিনালের মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামো পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছিল, যা কর্মীদের কর্মসংস্থান ও বেতনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করে।
ধর্মঘটের ফলে কন্টেইনার ও পণ্য হ্যান্ডলিং, জেটি থেকে পণ্য লোডিং, গুদাম থেকে ডেলিভারি এবং জাহাজের চলাচল সম্পূর্ণভাবে থেমে গেছে। বন্দর কর্মীদের উপস্থিতি না থাকায় টার্মিনালের যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না, ফলে আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলোর সময়সূচি ব্যাহত হয়েছে। এই পরিস্থিতি দেশের রপ্তানি-আমদানি কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান বাণিজ্যিক গেট হিসেবে কাজ করে।
প্রাতঃকালের সময় কর্মীরা বন্দর প্রবেশদ্বারগুলোতে অবস্থান করে বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করেছে। ট্রাফিক, ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল বিভাগে কাজ করা কর্মী ও কর্মকর্তারা প্রবেশের অনুমতি পায়নি, শুধুমাত্র নিরাপত্তা কর্মীকে ছাড়া। এই ধরনের কঠোর পদক্ষেপ ধর্মঘটকে আরও কঠোর করে তুলেছে এবং বন্দর পরিচালনায় অতিরিক্ত জটিলতা যোগ করেছে।
শিপিং উপদেষ্টা এসএম শাখাওয়াত হোসেন আজ সকালেই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সম্মেলন কক্ষে জরুরি বৈঠকের জন্য উপস্থিত হবেন। এই বৈঠকে বন্দর কর্তৃপক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তারা এবং বিভিন্ন বিভাগের প্রধানরা অংশ নেবেন। বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য হল ধর্মঘটের সমাধান খোঁজা এবং বন্দর কার্যক্রম পুনরায় চালু করার পথ নির্ধারণ করা।
বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব গত সন্ধ্যায় একটি চিঠি জারি করে চট্টগ্রাম ড্রাই ডক লিমিটেড (CDDL) – যা বর্তমানে NCT পরিচালনা করে – এর ম্যানেজিং ডিরেক্টরকে অনুরোধ করেন যে টার্মিনাল থেকে এক বা দুইজন কর্মী প্রতিনিধিকে বৈঠকে উপস্থিত করা হোক। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে কর্মীদের মতামত শোনা এবং সমঝোতা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ধর্মঘটের সমাধানে আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অংশগ্রহণও নিশ্চিত করা হয়েছে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ, ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স, বাংলাদেশ গার্ড, বাংলাদেশ নৌবাহিনী এবং বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের প্রতিনিধিদের বৈঠকে অংশ নিতে বলা হয়েছে। এই সংস্থাগুলো ধর্মঘটের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং বন্দর নিরাপত্তা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
শিপিং উপদেষ্টা এসএম শাখাওয়াত হোসেন গত রাতেই নিশ্চিত করেছেন যে তিনি আজ বন্দর পরিদর্শন করবেন এবং ধর্মঘটকারী কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তিনি উল্লেখ করেন যে বন্দর কার্যক্রমের দ্রুত পুনরুদ্ধার দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থের জন্য অপরিহার্য।
বন্দরের সম্পূর্ণ বন্ধ অবস্থার ফলে শিপিং লাইনগুলো বিকল্প রুট খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে, যা অতিরিক্ত খরচ এবং সময়সীমা বাড়িয়ে দেয়। কন্টেইনারের গতি ধীর হওয়ায় রপ্তানি পণ্যের ডেলিভারিতে বিলম্ব ঘটতে পারে, ফলে রপ্তানিকারকদের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। একই সঙ্গে, আমদানি পণ্যের সাপ্লাই চেইনেও ব্যাঘাত দেখা দিতে পারে, যা স্থানীয় বাজারে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করতে পারে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে বন্দর বন্ধ থাকা দেশের বন্দর রাজস্বে উল্লেখযোগ্য হ্রাস ঘটাবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বার্ষিক আয় মূলত কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ফি, লোডিং-আনলোডিং চার্জ এবং সেবা ফি থেকে আসে; এই সবই ধর্মঘটের ফলে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতি বৃদ্ধি পাবে।
দীর্ঘমেয়াদী ধর্মঘটের সম্ভাবনা থাকলে দেশের রপ্তানি-আমদানি পরিমাণে প্রভাব পড়তে পারে, বিশেষ করে যেসব পণ্য চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে রপ্তানি হয় সেগুলোর সময়মত শিপমেন্টে বাধা সৃষ্টি হবে। আন্তর্জাতিক শিপিং পার্টনারদের সঙ্গে চুক্তি পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে, যা ভবিষ্যতে বন্দর ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা বাড়াবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য হল দ্রুত সমঝোতা করে কার্যক্রম পুনরায় চালু করা এবং বাণিজ্যিক ক্ষতি কমিয়ে আনা। শিপিং উপদেষ্টা এসএম শাখাওয়াত হোসেনের নেতৃত্বে আজকের বৈঠকে উভয় পক্ষের চাহিদা ও উদ্বেগ বিবেচনা করে সমাধানের পথ নির্ধারণের আশা করা হচ্ছে। ধর্মঘটের সমাধান না হলে বন্দর ও দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়তে পারে, তাই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।



