ঢাকা, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬—সর্বোচ্চ আদালত রেজিস্ট্রি ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘোষণা করেছে, যা মামলার দাখিল ও অনুসরণ প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল করে ত্বরান্বিত করবে। নতুন পদ্ধতি অনলাইন ফাইলিং, ফি হ্রাস এবং স্বয়ংক্রিয় নোটিফিকেশন অন্তর্ভুক্ত করে। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নাগরিক সেবার মান উন্নত করা।
গত কয়েক বছর ধরে রেজিস্ট্রি দেরি, কাগজপত্রের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং ফি সংক্রান্ত অস্পষ্টতা নিয়ে অভিযোগ উঠে আসছে। বিশেষ করে উচ্চ পরিমাণের সিভিল ও ফৌজদারি মামলায় দাখিলের সময়সীমা বাড়ে, যা বিচারিক ব্যাকলগকে বাড়িয়ে দেয়। এসব সমস্যার সমাধানে সর্বোচ্চ আদালত নতুন নীতি প্রণয়ন করেছে।
প্রধান পরিবর্তনগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি একক অনলাইন পোর্টাল চালু করা, যেখানে আইনজীবী ও পক্ষগণ ইলেকট্রনিকভাবে দাখিল, সংশোধন ও ট্র্যাক করতে পারবেন। ফি কাঠামোও পুনর্বিবেচনা করে, প্রাথমিক দাখিলের জন্য হ্রাসকৃত হার নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকা নাগরিকদের প্রবেশাধিকার সহজ হয়।
নতুন সিস্টেমে সিভিল, ফৌজদারি, পারিবারিক এবং হাইকোর্টের রেজিস্ট্রি সবই একত্রে পরিচালিত হবে। ই-ফাইলিংয়ের মাধ্যমে কেসের অগ্রগতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট পক্ষের মোবাইল ও ইমেইলে জানানো হবে, ফলে শারীরিক উপস্থিতি কমে যাবে এবং সময়সীমা মেনে চলা সহজ হবে।
প্রয়োগের ধাপটি দুই স্তরে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমে মার্চ মাসে ঢাকা রেজিস্ট্রি অফিসে পাইলট চালু হবে, যেখানে সীমিত সংখ্যক মামলায় সিস্টেম পরীক্ষা করা হবে। সফলতা নিশ্চিত হলে, জুনের শেষের দিকে দেশের সব রেজিস্ট্রি অফিসে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হবে।
সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি এই পরিবর্তনকে “বিচারপ্রবাহের আধুনিকায়ন” হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং উল্লেখ করেছেন, ডিজিটাল রেজিস্ট্রি ভবিষ্যতে মামলার সমাধানকে দ্রুততর করবে। তিনি আরও বলেন, নতুন পদ্ধতি স্বচ্ছতা বাড়িয়ে নাগরিকের বিশ্বাস জোরদার করবে।
বঙ্গীয় আইনজীবী সমিতি এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে, তবে কিছু উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সমিতির প্রতিনিধিরা উল্লেখ করেন, সব আইনজীবীরই ডিজিটাল দক্ষতা সমান নয় এবং গ্রামীণ অঞ্চলের ইন্টারনেট সংযোগের সীমাবদ্ধতা সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। তাই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সহায়তা সেবা নিশ্চিত করা দরকার।
অন্যদিকে, অভিজ্ঞ সিভিল আইনজীবী রাহুল চৌধুরী নতুন সিস্টেমের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী। তিনি বলেন, অনলাইন ফাইলিংয়ের মাধ্যমে কোর্টে ভ্রমণের সময় ও খরচ কমবে, যা বিশেষ করে ছোট মামলায় দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে। তিনি আরও যোগ করেন, ফি হ্রাসের ফলে দরিদ্র ক্লায়েন্টদের অধিকার রক্ষায় সুবিধা হবে।
প্রযুক্তিগত সহায়তার জন্য সর্বোচ্চ আদালত একটি ২৪ ঘণ্টা হেল্পডেস্ক স্থাপন করেছে, যেখানে ব্যবহারকারীরা পোর্টাল ব্যবহারের সময় যে কোনো সমস্যার সমাধান পেতে পারবেন। পাশাপাশি, রেজিস্ট্রি কর্মীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ সেশন এবং ব্যবহারকারী ম্যানুয়াল প্রকাশ করা হবে, যাতে সিস্টেমের সুষ্ঠু চালু নিশ্চিত হয়।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, নতুন রেজিস্ট্রি পদ্ধতি ব্যাকলগ কমিয়ে আগামী দুই বছরের মধ্যে প্রায় ৩০% মামলার সমাধান সময় হ্রাস করতে পারে। দ্রুত নোটিফিকেশন ও স্বয়ংক্রিয় রিমাইন্ডার সিস্টেমের ফলে অনুপস্থিতি ও দেরি কমবে, যা কোর্টের কার্যকারিতা বাড়াবে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই পরিবর্তন উচ্চপ্রোফাইল মামলায় দ্রুত রায়ের সম্ভাবনা বাড়াবে। বিশেষ করে নির্বাচনী বিরোধ, দুর্নীতি ও মানবাধিকার সংক্রান্ত মামলায় দাখিলের সময় কমে গেলে বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সর্বোচ্চ আদালত ভবিষ্যতে এই সিস্টেমের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করে, প্রয়োজনমতো সংশোধনী আনা হবে। নিয়মিত প্রতিবেদন ও ব্যবহারকারীর প্রতিক্রিয়া সংগ্রহের মাধ্যমে সেবা মান উন্নয়ন চালিয়ে যাওয়া হবে, যাতে ডিজিটাল রেজিস্ট্রি দীর্ঘমেয়াদে দেশের বিচার ব্যবস্থার ভিত্তি হয়ে ওঠে।



