কিয়েভের এক সমাধিস্থলে সামরিক সম্মানসূচক শপথের আওয়াজে গর্জন, তৎপরই রাইফেল গুলির শব্দ শোনা যায়। নাতালিয়া তার স্বামী ভিটালি’র দেহকে দ্বিতীয়বার সমাধিস্থলে রাখছেন, যেখানে সাদা তুষার ও ইউক্রেনীয় পতাকা একসঙ্গে সজ্জিত। তার কান্না ও মুখের ভঙ্গি এই পুনর্বসানের মানসিক তীব্রতা প্রকাশ করে।
ভিটালি তিন বছর আগে ডনবাসের পূর্বাঞ্চলে লড়াইয়ের সময় নিহত হন এবং প্রথম সমাধি তার জন্মস্থান স্লোভিয়ান্সে করা হয়েছিল। তবে রাশিয়ার সামরিক অগ্রগতি এবং ক্রমবর্ধমান আক্রমণের কারণে ঐ অঞ্চলটি ক্রমশ অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। তাই নাতালিয়া সিদ্ধান্ত নেন, স্বামীর দেহকে স্লোভিয়ান্স থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে কিয়েভে স্থানান্তর করা হবে।
ভিটালি একজন সিরামিক শিল্পী ছিলেন, যিনি ২০২২ সালের রাশিয়ার পূর্ণমাত্রিক আক্রমণের প্রথম দিনগুলোতে স্বেচ্ছায় সামরিক সেবায় যোগ দেন। তিনি নিজে না চাইলেও দেশের রক্ষায় লড়াই করতে বাধ্য হন এবং তা তাকে দেশপ্রেমিক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তার মৃত্যু সময় নাতালিয়া গর্ভবতী ছিলেন, ফলে তাদের কন্যা কখনো স্বামীর মুখ দেখেনি।
স্লোভিয়ান্সে সমাধি করা সময়, “ভূমি মুক্ত হচ্ছিল এবং যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হবে” নাতালিয়া বলেন। তবে সামনের দিনগুলোতে ফ্রন্টলাইন ক্রমাগত কাছাকাছি আসতে থাকে, ফলে তিনি ভয় পেয়েছিলেন যে রাশিয়া দখলে স্বামী তার শবস্থান হারিয়ে যাবে। এই উদ্বেগই তাকে দেহটি কিয়েভে স্থানান্তরের দিকে ধাবিত করে।
নাতালিয়া জানান, “এটি মানসিকভাবে খুব কঠিন ছিল, তবে সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল।” তিনি যোগ করেন, স্বামীকে দখলে থাকা ভূমিতে রেখে যাওয়া মানসিকভাবে আরও কষ্টকর হতো। তার কথায় স্পষ্ট যে, পুনর্বসানটি কেবল শারীরিক নয়, মানসিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
দেহটি স্লোভিয়ান্স থেকে কিয়েভে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া সামরিক নিরাপত্তা ও বিশেষ পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। দেহটি সতর্কতার সাথে উত্তোলন করে, রক্তচাপ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখে গাড়িতে লোড করা হয় এবং রাশিয়ান সামরিক গোষ্ঠীর সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে গোপন পথে গমন করা হয়। শেষ পর্যন্ত কিয়েভের সমাধিস্থলে পুনরায় সমাধি করা হয়, যেখানে সৈন্যরা ইউক্রেনীয় পতাকা ও শপথের আওয়াজে সম্মানসূচক অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে।
এই ঘটনা ইউক্রেনের সাম্প্রতিক যুদ্ধের পরিবর্তনশীল গতি-প্রকৃতির একটি উদাহরণ। ডনবাসের পূর্বাঞ্চলে রাশিয়ার অগ্রগতি এবং ক্রমবর্ধমান শত্রুতা স্থানীয় বাসিন্দাদেরকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে, যার মধ্যে সমাধি স্থানান্তরও অন্তর্ভুক্ত। সামরিক লাইন ক্রমাগত সরিয়ে নেওয়া নাগরিকদের নিরাপত্তা ও পরিচয় সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জ বাড়িয়ে তুলেছে।
ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা চলছে। তবে রাশিয়ার আক্রমণ চালিয়ে যাওয়া এবং ইউক্রেনের শক্তি ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক বায়ু হামলা আলোচনার জটিলতা বাড়িয়ে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে কিয়েভের উপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে, যাতে ইউক্রেনের সরকার আলোচনায় সমঝোতা করতে পারে।
রাশিয়ার বায়ু হামলা বিশেষ করে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ককে লক্ষ্যবস্তু করে, যা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়। এই ধরনের আক্রমণ দেশীয় অবকাঠামোকে ধ্বংস করে, নাগরিকদের মৌলিক জীবনের শর্তকে বিপন্ন করে এবং যুদ্ধের মানবিক দিককে আরও তীব্র করে তুলেছে।
শান্তি আলোচনার সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হল ডনবাসের পূর্বাঞ্চলের ভূমি-সীমা, যেখানে বহু সৈন্য প্রাণ হারিয়েছেন। বর্তমানে ইউক্রেন প্রায় এক পঞ্চমাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখে, যার মধ্যে স্লোভিয়ান্সও অন্তর্ভুক্ত। এই অঞ্চলটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং যুদ্ধের বাস্তবিক পরিবর্তন একসাথে কাজ করবে।
নাতালিয়ার ব্যক্তিগত ক্ষতি ও তার স্বামীর সমাধি স্থানান্তর যুদ্ধের মানবিক দিককে উন্মোচিত করে। তিনি বলেন, “যদি স্বামীকে দখলে থাকা ভূমিতে রেখে যেতাম, তবে তা আমার জন্য আরও বড় কষ্ট হতো।” তার গল্প ইউক্রেনীয় নাগরিকদের মুখোমুখি হওয়া কঠিন পছন্দগুলোর একটি প্রতিফলন, যেখানে নিরাপত্তা, স্মৃতি ও জাতীয় গর্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা হয়।



