জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালীন মাদক পাচারকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীর মনোযোগের বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কার্যক্রম বাড়িয়ে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনের সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা সংস্থাগুলোর কাজের চাপ বাড়ার ফলে নজরদারিতে সাময়িক শিথিলতা দেখা দিচ্ছে, যা মাদক সরবরাহকারীদের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করেছে।
গত মঙ্গলবার কক্সবাজার থেকে রাজধানীর যাত্রাবাড়িতে চলা একটি বিলাসবহুল বাসে ১১,০০০ পিস ইয়াবা গুলি জব্দ করা হয়। একই সপ্তাহের রবিবার বগুড়া থেকে আসা আরেকটি বিলাসী বাসে প্রায় ১,৫০০ পিস ইয়াবা গুলি এবং দুইজন সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার করা হয়। এই দুইটি বড় জব্দের মাধ্যমে নির্বাচনের আগে মাদক প্রবাহের মাত্রা বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
মাদকবিরোধী সংগঠন ‘মানস’ের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী উল্লেখ করেন, নির্বাচনের সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা সংস্থাগুলোর কাজের পরিধি বিস্তৃত হওয়ায় মাদক ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক ছায়া ব্যবহার করে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এই সময়ে মাদকের চাহিদা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে, ফলে সরবরাহ চেইন দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠে।
ডিএনসির (ড্রাগ ন্যাশনাল কন্ট্রোল সেন্টার) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ইউনিটপ্রধানদের বৈঠকে মহাপরিচালক হাসান মারুফ নিরাপত্তা ব্যবস্থার তীব্রতা বাড়ানোর নির্দেশ দেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নির্বাচনের সুযোগে মাদক ব্যবসায়ীর তৎপরতা রোধের জন্য গোয়েন্দা নজরদারি, ঝটিকা অভিযান এবং কর্মীদের ছুটি বাতিল করা হবে। এছাড়া, সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত তদারকি এবং রেলপথ, নদীপথের মাধ্যমে গমনাগমন নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, দেশের অধিকাংশ মাদকদ্রব্য ভারত ও মায়ানমার সীমান্ত থেকে প্রবেশ করছে। স্থলপথ, নদীপথ, রেলপথ এবং দূরবর্তী সীমান্ত ব্যবহার করে ইয়াবা, ফেনসিডিল, ক্রিস্টাল মেথ (আইস), গাঁজা এবং বিভিন্ন কৃত্রিম নেশাজাতীয় পদার্থ দেশের বাজারে পৌঁছাচ্ছে। এই প্রবাহের মূল রুটগুলোতে নজরদারির ফাঁকফোকর চিহ্নিত হয়ে মাদক সরবরাহকারীরা সেগুলো ব্যবহার করে গতি বাড়িয়ে তুলছে।
বিজিবি (বিজিবি) দিনাজপুরের ফুলবাড়ি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এ এম জাবের বিন জব্বার জানান, নির্বাচনের পূর্বে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, সীমান্ত এলাকায় অপরাধমুক্ত রাখতে অতিরিক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং এই ব্যবস্থা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন, নির্বাচনের সময় মাদক চাহিদা বৃদ্ধি পেলে তা সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই, নিরাপত্তা বাহিনীর তীব্রতা বজায় রেখে, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। ডিএনসির নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্বাচনের সময়কালীন সব ধরণের ছুটি বাতিল করা হয়েছে যাতে কর্মীরা সর্বদা প্রস্তুত থাকে।
সামগ্রিকভাবে, নির্বাচনের সময় মাদক ব্যবসা বাড়ার প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কাজের পরিধি বিস্তৃত হওয়ায়, মাদক সরবরাহকারীরা ফাঁকফোকর খুঁজে বের করে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে এই ফাঁকগুলো বন্ধ করতে তৎপরতা দেখাতে হবে, যাতে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা বজায় থাকে।
আসন্ন নির্বাচনের দিনগুলোতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তীব্রতা, ডিএনসির গোয়েন্দা অভিযান এবং সীমান্তে অতিরিক্ত তদারকি মাদক প্রবাহ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মাদকবিরোধী সংগঠন ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা কঠিন হবে।



