নিউইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গৃহীত অন্তর্বর্তী সরকার গুম বন্ধের পরেও গণগ্রেপ্তার এবং জামিন না দেওয়ার প্রথা চালিয়ে যাচ্ছে।
শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে গুমসহ ব্যাপক দমন ও ভয়ভীতি চালু ছিল, তবে সংস্থা উল্লেখ করেছে যে তার শাসনের শেষের দিকে কিছুটা শিথিলতা দেখা গিয়েছিল।
২০২৪ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং মানবাধিকার সংস্কার বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। সরকার দাবি করে যে এই সংস্কারগুলো নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ত্বরান্বিত করা হবে।
গত বছরের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, যা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও সংকটময় করে তুলেছে।
১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। এই রায়ের পর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ফেব্রুয়ারি মাসে সরকার তফসিল ঘোষণা করে, যার মাধ্যমে ২০২৪ সালের শেষের দিকে সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তফসিলের লক্ষ্য নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত করা।
এইচআরডব্লিউ রেকর্ড করেছে, রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বাইরে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠীর সহিংস কর্মকাণ্ড অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য গুরুতর উদ্বেগের কারণ। বিশেষ করে নারী অধিকার ও এলজিবিটিবি বিরোধী কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর উপস্থিতি নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত গণপিটুনিতে অন্তত ১২৪ জন নিহত হয়েছেন। এই সংখ্যা দেশের সাম্প্রতিক সহিংসতার মাত্রা প্রকাশ করে।
এইচআরডব্লিউের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ শাসনের সময় চালু হওয়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও নির্বিচার গ্রেপ্তার প্রথা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও অব্যাহত রয়েছে। অজ্ঞাতনামা হিসেবে বহু ব্যক্তিকে অপরাধমূলক অভিযোগে অভিযুক্ত করা হচ্ছে।
বর্তমানে শত শত আওয়ামী লীগ নেতা, কর্মী ও সমর্থককে হত্যার সন্দেহভাজন হিসেবে কারাবন্দী রাখা হয়েছে। আদালতের হস্তক্ষেপ ছাড়া এই ব্যক্তিদের জামিন প্রায়ই প্রত্যাখ্যান করা হয়, যা মানবাধিকার সংস্থার সমালোচনার মুখে পড়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার এই অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে, তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং মানবাধিকার সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো গড়ে তুলছে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বাস্তব সংস্কার না হলে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ আরও অস্থির হতে পারে।
আসন্ন তফসিলভিত্তিক নির্বাচন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে নির্ধারণের মূল দিক হয়ে দাঁড়াবে। যদি মানবাধিকার লঙ্ঘন অব্যাহত থাকে, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ বাড়তে পারে এবং নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে।



