অভিনেতা-রাজনীতিবিদ শত্রুঘন সিনহা ইউসিসি (ইউনিফর্ম সিভিল কোড) সংক্রান্ত তার মন্তব্যের পর সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার মুখে পড়েছেন। উট্রাখণ্ডে সরকার ইউসিসি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তিনি এই বিষয়ে তার মতামত প্রকাশ করেন। তবে তার উক্তিতে দেশব্যাপী মাংসভোজ্য খাবার নিষেধের আহ্বান নেটিজেনদের কাছ থেকে তীব্র বিরোধিতা ও সমালোচনা উসকে দেয়।
উট্রাখণ্ডে সাম্প্রতিক সময়ে ইউসিসি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা সরকারী নথিতে প্রকাশিত হয়, যা ধর্মনিরপেক্ষ বিবাহ ও সম্পত্তি অধিকারকে একক আইনে সংহত করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপকে কিছু রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষক ইতিবাচকভাবে স্বাগত জানায়, তবে একই সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে বিতর্কের সঞ্চার করে।
সিনহা ইউসিসি প্রয়োগকে “প্রাথমিকভাবে প্রশংসনীয়” বলে উল্লেখ করেন এবং দেশের সকল অংশে এই কোডের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তবে তিনি উল্লেখ করেন যে নীতির কিছু সূক্ষ্ম দিক ও সম্ভাব্য ফাঁক-ফাঁকি রয়েছে, যা যথাযথভাবে সমাধান না করা হলে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। তার বক্তব্যে তিনি বিশেষ করে খাবার সংক্রান্ত বিষয়কে কোডের সঙ্গে যুক্ত করে একটি বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানান।
সিনহা বলেন, “মাংসভোজ্য খাবারসহ সকল নন-ভেজ খাবারকে দেশের স্তরে নিষিদ্ধ করা উচিত” এবং যুক্তি দেন যে উত্তর ভারতের কিছু বিধি পূর্বোত্তর অঞ্চলে প্রয়োগ করা যায় না। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে ইউসিসি সংক্রান্ত কোনো চূড়ান্ত নথি তৈরি করার আগে সব পার্টির সমন্বয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন। এই মন্তব্যগুলো সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন মতামতকে উসকে দেয়।
অনলাইন ব্যবহারকারীরা তার মন্তব্যকে অযৌক্তিক ও অপ্রাসঙ্গিক বলে সমালোচনা করেন। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, ইউসিসি কি খাবারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে কিনা এবং কেন একটি আইনি কাঠামোকে খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। নেটিজেনদের মন্তব্যে দেখা যায়, ইউসিসি মূলত বিবাহ ও সম্পত্তি সংক্রান্ত বিষয়ের জন্য, খাবার সংক্রান্ত কোনো বিধান এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।
কিছু মন্তব্যে তীব্র বিরক্তি প্রকাশ পায়, যেখানে ব্যবহারকারীরা বলেন যে সংসদ সদস্যের এই ধরনের বক্তব্য আইনগত জ্ঞানহীনতা প্রকাশ করে এবং দেশের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। অন্যদিকে, কিছু ব্যবহারকারী তার মন্তব্যকে অপ্রয়োজনীয় বলে চিহ্নিত করে এবং ইউসিসি সংক্রান্ত আলোচনাকে স্বতন্ত্রভাবে চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
সিনহার মন্তব্যের পাশাপাশি তার কন্যা সোনাক্ষী সিনহার ইন্টার-রিলিজিয়াস বিবাহের কথাও নেটিজেনদের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। জাহির ইকবাল সঙ্গে তার বিবাহকে কিছু ব্যবহারকারী ধর্মীয় সংবেদনশীলতা লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে সমালোচনা করেন। এই বিষয়টি রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আরও তীব্রতা পায়।
অল ইন্ডিয়া ত্রিনামুল কংগ্রেসের একজন সংসদ সদস্য ইউসিসি প্রয়োগকে স্বাগত জানিয়ে, এর প্রয়োজনীয়তা ও ইতিবাচক দিক তুলে ধরেছেন। তবে তিনি সিনহার মাংসভোজ্য খাবার নিষেধের আহ্বানকে আলাদা করে উল্লেখ করে, তা দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি অসম্মানজনক বলে সমালোচনা করেন। এই পার্থক্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি রাজনৈতিক আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দেন যে সিনহার মন্তব্য ভবিষ্যতে ইউসিসি সংক্রান্ত আইন প্রণয়নে অতিরিক্ত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। তিনি যদি কোনো আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা নেন, তবে তা বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত করতে পারে। তাই, সকল সংশ্লিষ্ট পক্ষের সমন্বয়ে একটি ব্যাপক আলোচনা ও সমঝোতা প্রয়োজন।
প্রস্তাবিত সব-দলীয় বৈঠকের মাধ্যমে ইউসিসি সংক্রান্ত নীতিমালা তৈরি করা হলে, তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সামাজিক-সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে বিবেচনা করে সমন্বিতভাবে গঠন করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিশেষ খাদ্যাভ্যাস ও ধর্মীয় রীতিনীতি বিবেচনা না করলে নীতি ব্যর্থতার মুখে পড়তে পারে।
সিনহার মন্তব্যের ফলে সামাজিক মাধ্যমে উন্মুক্ত বিতর্কের সূচনা হয়েছে, যা ইউসিসি সংক্রান্ত নীতি গঠনের প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের বিতর্কের সমাধান কীভাবে হবে, তা রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি ও জনমত গঠনের ওপর নির্ভরশীল থাকবে।



